পরিবেশ রক্ষার বার্তা নিয়ে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত হেঁটে পদযাত্রা করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তরুণ পরিবেশকর্মী ফাহিম মুনতাসির। ‘কালো ধোঁয়া আর নয়, হেঁটেই করব দূরত্ব জয়’ স্লোগানকে সামনে রেখে গত শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টায় টেকনাফ জিরো পয়েন্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ১৭ জুলাই পদযাত্রার অষ্টম দিন বিকেলে তিনি বৈরী আবহাওয়া অতিক্রম করে কুমিল্লা গৌরিপুরে পৌঁছান।
দেশের সর্ব দক্ষিণের জনপদ টেকনাফ থেকে সর্বউত্তরের তেঁতুলিয়ার দুরত্ব প্রায় ১ হাজার ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই পথ ২০ দিনের মধ্যে অতিক্রমের লক্ষ্য নিয়েছেন ফাহিম। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিদিন গড়ে ৬০ কিলোমিটার এবং প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫ কিলোমিটার গতিতে হাঁটছেন তিনি। তার এই যাত্রায় সাথী হয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দুই তরুণ প্রণব দেবনাথ ও ফাইয়াজ ফারসিদ মুবিন। তারা তিনজনই ব্যক্তিগত অর্থায়নে এই পরিবেশ সচেতনতামূলক পদযাত্রা করছেন বলে জানিয়েছেন ফাহিম।
ফাহিম বলেন, এই যাত্রার উদ্দেশ্য শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়। আমরা চাই, সবাই বুঝুক যে, অল্প দূরত্বে হাঁটা শুধু শরীরের জন্য নয়, পরিবেশের জন্যও উপকারী। আমি বিশ্বাস করি, আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন নিজের সুস্থতা এবং পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নটি একই সুতোয় গাঁথা। সেই বিশ্বাস থেকেই এই পথচলা। আমার এই যাত্রা কোনো রেকর্ড গড়ার জন্য নয়। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের প্রচারণার জন্যও নয়। আমি বিশ্বাস করি, আমরা এমন একটি সময়ে বাস করছি যখন নিজের সুস্থতা এবং পৃথিবীকে বাঁচিয়ে রাখার প্রশ্নটি একই সুতোয় গাঁথা। ওই বিশ্বাস থেকেই এই পথচলা। তিনি বলেন, আমার এই পদযাত্রা সেই ছোট পরিবর্তনের পক্ষেই একটি আহ্বান। আমি পথে পথে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে চাই। শিশুদের বলতে চাই মোবাইলের স্ক্রিনের বাইরে একটা পৃথিবী আছে, যেখানে হাঁটার আনন্দ আছে। তরুণদের বলতে চাই একটি সুঠাম দেহ কেবল প্রদর্শনের বস্তু নয়, এটি প্রয়োজন। সবাইকে বলতে চাই পরিবেশ রক্ষার লড়াই শুধু বড় বড় সম্মেলন করেই হয় না শুরু হয় আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে।
ফাহিম বলেন, এক সময় হাঁটা ছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অংশ। বাজারে যাওয়া, স্কুলে যাওয়া, বন্ধুর বাড়ি যাওয়া অনেক পথই মানুষ হেঁটে পার করত। এখন সময় বদলেছে। কয়েকশ মিটার দূরত্বেও আমরা মোটরসাইকেল বা গাড়ির কথা ভাবি। হাঁটতে আমাদের অনীহা তৈরি হয়েছে। অথচ আমাদের শরীর হাঁটার জন্যই তৈরি। তিনি বলেন, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার পদক্ষেপ হাঁটা প্রয়োজন। নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখে, ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়, শরীরের অতিরিক্ত ওজন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে, মানসিক চাপ কমায় এবং মানুষকে কর্মক্ষম রাখে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমরা যত আধুনিক হচ্ছি, তত কম হাঁটছি। এর ফলও আমরা পাচ্ছি অল্প বয়সেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ ও নানা অসংক্রামক রোগ বাড়ছে।
ফাহিম বলেন, আরেকটি বড় সংকট আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে জলবায়ু পরিবর্তন। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার এর অন্যতম প্রধান কারণ। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করছে, কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাব শুধু শহরের বাতাসেই সীমাবদ্ধ নয় মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এই সংকটের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলের মানুষ, কৃষক, জেলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন তারাই, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে কম দায়ীও তারাই। তাই পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, আমাদের প্রত্যেকের।
পদযাত্রাকালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে ফাহিম মতবিনিময়ের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে বিভিন্ন স্থানে বীজ বপন ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করছেন। তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায়িত্ব। আসুন, আমরা যতটা সম্ভব হাঁটি। প্রয়োজন হলে গণপরিবহন ব্যবহার করি। অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত যানবাহনের ব্যবহার কমাই। নিজের শরীরকে সুস্থ রাখি, পৃথিবীকে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে সাহায্য করি।
ফাহিম মুনতাসির ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি ফাহিম লেখালেখি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত। তিনি বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনিটের যুবপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কেএমএএ/আপ্র/১৯.০৭.২০২৬