৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশ্বজুড়ে এই দিনটি নারীর অধিকার, মর্যাদা ও সমতার প্রশ্নকে সামনে আনে। বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হলো নানা আয়োজন ও প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বলেছেন, বাংলাদেশের অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠী নারী। তাদের রাষ্ট্র ও সমাজের মূলধারার বাইরে রেখে জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেছেন।
এই বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু একই সময়ে দেশের রাজনীতির বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করছে-বাংলাদেশের গণতন্ত্রে নারীর প্রকৃত অবস্থান কোথায়?
সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই প্রশ্নকে আরো তীব্র করেছে। জাতীয় সংসদ, যা দেশের সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ এবার আশানুরূপ নয়। আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো-একটি বড় রাজনৈতিক দল নারী প্রার্থীই দেয়নি।
এটি নিছক দলীয় নীতি বা কৌশল বলে এড়িয়ে যাওয়ার বিষয় নয়। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীর নেতৃত্ব কোনো ব্যতিক্রম ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘ সময়ের বাস্তবতা। স্বাধীনতার পর প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় দেশ পরিচালিত হয়েছে দুই নারী নেত্রীর নেতৃত্বে। তাঁরা শুধু রাজনীতির অংশই ছিলেন না, রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই এবারের নারী দিবসে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ‘শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়েছে-যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীর অবদানের স্বীকৃতিই বহন করে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। তাঁর পরিবারেও উচ্চশিক্ষিত ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত নারীর উপস্থিতি রয়েছে-তাঁর স্ত্রী ও কন্যা উভয়েই শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে সক্রিয়। ভবিষ্যতে তাঁরা বা দেশের অন্য কোনো নারী নেতৃত্বে আসবেন-এটি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারা। কারণ নেতৃত্ব কোনো লিঙ্গের একচেটিয়া অধিকার নয়; এটি যোগ্যতা ও জনসমর্থনের বিষয়।
এই প্রেক্ষাপটে রাজনীতির মাঠে নারীর প্রতিনিধিত্ব হঠাৎ কমে যাওয়া এবং কোনো কোনো দল একেবারেই নারী প্রার্থী না দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। এতে এমন একটি ধারণা তৈরি হয়-বাংলাদেশ কি ধীরে ধীরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে নারীর উপস্থিতি প্রতীকী থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের জায়গা সংকুচিত হবে?
যদি এমন প্রবণতা শক্তিশালী হয়, তবে তা শুধু নারী অধিকারের প্রশ্ন নয়; এটি গণতন্ত্রের মৌলিক চেতনাকেও আঘাত করবে। কারণ সংসদ হলো জনগণের প্রতিচ্ছবি, আর সেই জনগণের প্রায় অর্ধেকই নারী।
রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের সক্রিয়ভাবে ব্যবহার করে, তাদের ভোটের গুরুত্বও স্বীকার করে। কিন্তু প্রার্থী তালিকা তৈরির সময় সেই বাস্তবতা প্রতিফলিত না হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়-ভোটে নারী, প্রচারে নারী, কিন্তু প্রার্থী তালিকায় কেন নারী নয়?
এ বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং নারীর ন্যূনতম প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মতো নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন রাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান থাকে।
আন্তর্জাতিক নারী দিবস তাই শুধু প্রতীকী উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও বাস্তব পরিবর্তনের আহ্বান। কারণ ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে-অর্ধেক আকাশকে পাশে না নিয়ে কোনো জাতির অগ্রযাত্রা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
সানা/আপ্র/৯/৩/২০২৬