বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ‘পুশইন’ প্রচেষ্টা শুধু সীমান্ত ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়, এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পঞ্চগড়, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুর সীমান্তে নারী ও শিশুসহ বিভিন্ন দলকে জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার একাধিক প্রচেষ্টা উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। এসব ঘটনায় সীমান্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে, শূন্যরেখায় অসহায় মানুষের মানবেতর অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সম্পর্কও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব অভিবাসন ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নীতি রয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে যথাযথ যাচাই, আইনি প্রক্রিয়া ও দ্বিপক্ষীয় সমন্বয় ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশে বাধ্য করা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে যখন সেই ব্যক্তিদের মধ্যে নারী ও শিশু থাকে, তখন বিষয়টি কেবল নিরাপত্তার নয়, মানবিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রশংসার দাবিদার। আন্তর্জাতিক বিধি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা সীমান্ত নিরাপত্তাকে আরো কার্যকর করেছে। তবে এই সাফল্যের আড়ালে একটি বৃহত্তর বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সীমান্তে বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে তা কেবল তাৎক্ষণিক উত্তেজনা নয়-দীর্ঘমেয়াদে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্যও অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, শূন্যরেখায় আটকে পড়া নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষের দুর্দশা। প্রবল বৃষ্টি, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে খোলা আকাশের নিচে তাদের অবস্থান মানবিক মূল্যবোধকে নাড়া দেয়। রাষ্ট্রীয় বিরোধ বা প্রশাসনিক জটিলতার দায় কোনো নিরীহ মানুষের কাঁধে চাপানো সভ্যতার পরিচায়ক হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোও এমন পরিস্থিতিতে মানবিক সুরক্ষা ও দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয় এবং কৌশলগত গুরুত্বসম্পন্ন। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সেই সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ক্ষেত্র। ফলে বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি হওয়া কারো জন্যই কল্যাণকর নয়। প্রয়োজন নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ, কার্যকর পতাকা বৈঠক, তথ্য বিনিময় এবং সন্দেহভাজন বা বিতর্কিত নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ের একটি স্বচ্ছ ও দ্রুত প্রক্রিয়া। সীমান্তকে কোনোভাবেই একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্র বানানো উচিত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে-সীমান্তে কাঁটাতারের চেয়ে বেশি প্রয়োজন পারস্পরিক আস্থা, আইনের প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানবিক দায়িত্ববোধ। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা যেমন অপরিহার্য, তেমনি অসহায় মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুই প্রতিবেশী দেশের উচিত উত্তেজনার পরিবর্তে সহযোগিতার পথ বেছে নেওয়া এবং এমন একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে সীমান্ত হবে নিরাপত্তার প্রতীক, কিন্তু মানবিকতার পরাজয়ের নয়। কারণ একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্র শুধু নিজের ভূখণ্ডই রক্ষা করে না, আন্তর্জাতিক ন্যায়নীতি ও মানবিক মূল্যবোধকেও সমুন্নত রাখে।
সানা/আপ্র/৮/৬/২০২৬