মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার আমগ্রাম ইউনিয়নের দক্ষিণ পাখুল্যায় ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর নামে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং লিবিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগ তুলে চারজনের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছেন এক ভুক্তভোগী ও তার পরিবার। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নেওয়া অর্থ ফেরতের দাবি জানানো হয়েছে।
বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে দক্ষিণ পাখুল্যায় ভুক্তভোগী লাল চাঁন বেপারীর বাড়িতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। এ সময় পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
লাল চাঁন বেপারীর অভিযোগ, অভিযুক্ত আওলাদ বয়াতি, লাভলী বেগম, উজ্জ্বল বয়াতি ও আলমগীর ফকির বৈধ পথে সরাসরি বিমানে ইতালি পাঠানো এবং সেখানে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তার সঙ্গে ২১ লাখ টাকায় চুক্তি করেন। একই গ্রামের সাদেক বয়াতিকে সাক্ষী রেখে এক বছর আগে ওই টাকা অভিযুক্তদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ইতালিতে না পাঠিয়ে তাকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে একটি মানব পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন। সেখানে তাকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে বাধ্য করা হয় এবং কাজে অস্বীকৃতি জানালে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়।
লাল চাঁন বেপারীর ভাষ্য, বিষয়টি তিনি পরিবারের সদস্যদের জানালে তারা অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন লিবিয়ায় অবস্থানরত পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে মুক্তিপণের নামে ভয়ভীতি দেখিয়ে আরো দুই দফায় ২৯ লাখ টাকা আদায় করা হয়। সব মিলিয়ে ইতালিতে পাঠানোর নামে তার পরিবারের কাছ থেকে মোট ৫০ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, পরে কোনোভাবে লিবিয়া থেকে পালিয়ে স্থানীয় পুলিশের হাতে আটক হন এবং সেখানে ৪৫ দিন কারাভোগের পর সংশ্লিষ্ট দেশটির সরকার তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠায়।
দেশে ফিরে ঘটনাটি স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানিয়ে অভিযুক্তদের কাছ থেকে টাকা ফেরত চাওয়া হলে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে লাল চাঁন বেপারী জানান, রাজৈর থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাকে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে গত ২০ জুলাই তিনি মাদারীপুর মানব পাচার দমন ট্রাইব্যুনালে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর- ২৭০/২০২৬। তিনি প্রশাসন ও সরকারের কাছে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি এবং তার পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া ৫০ লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার দাবি জানান।
ভুক্তভোগীর ভাই রুবেল বেপারী অভিযোগ করে বলেন, ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রথমে ২১ লাখ টাকা এবং পরে মুক্তিপণের নামে আরো ২৯ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। তিনি অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবার এ ধরনের প্রতারণার শিকার না হয়।
লাল চাঁন বেপারীর বাবা আলকাচ বেপারী বলেন, ছেলেকে বিদেশ পাঠানোর আশায় তিনি জমিজমাসহ প্রায় সব সম্পদ বিক্রি করেছেন। সব হারিয়েও ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
প্রতিবেশী খলিল বেপারী বলেন, বিদেশে পাঠানোর আশায় পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছে। মানব পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাক্ষী সাদেক বয়াতি দাবি করেন, ইতালিতে পাঠানোর চুক্তির সময় তিনি সাক্ষী ছিলেন। তার মাধ্যমে প্রথম দফায় ২১ লাখ টাকা এবং পরে আরো ১৪ লাখ ও ১৫ লাখ টাকা অভিযুক্তদের কাছে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, লাল চাঁন বেপারীকে ইতালি পাঠাতে না পারায় তিনি অভিযুক্তদের টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু তারা তা মানেননি। পরে তিনি ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেন।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৩/৭/২০২৬