সরকারবিরোধী মতপ্রকাশ করলেই কাউকে ধরে আনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) আয়োজিত ‘সাম্প্রতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট-সরকার ও জনগণের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
রিজভী বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দলের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার রয়েছে। সরকারের প্রতিটি কাজের সমালোচনার মাধ্যমে ভুল-ত্রুটি তুলে ধরা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। তবে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি অভিযোগ করেন, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং রাজপথে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তার দাবি, বর্তমান সংকট সরকারের তৈরি নয়; বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
সংকট সমাধানে উদ্যোগের দাবি
রিজভী বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকার বসে নেই। অতিরিক্ত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত গ্যাস আমদানির জন্য প্রতিবেশী ও নিকটবর্তী দেশগুলোর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে। মিয়ানমার, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেটি মেরামতের কাজ চলছে। একদিকে বৈশ্বিক যুদ্ধের কারণে এলএনজি সরবরাহে সমস্যা, অন্যদিকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি ও পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের আমদানি করা এলএনজির বড় একটি অংশও এ পথ দিয়ে আসে। ফলে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় গ্যাস সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার তাগিদ
রিজভী বলেন, কোনো রাজনৈতিক দল সরকারের সমালোচনা করলে শুধু সমস্যা তুলে ধরলেই হবে না, সংকট সমাধানের পথও দেখাতে হবে। বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সমাধানের রূপরেখা দেওয়ার।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল থাকায় দেশে গণতন্ত্র বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। উচ্চতর আদালত, গণমাধ্যম, পুলিশ প্রশাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে হবে।
তিনি বলেন, নতুন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশ যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় পুলিশ প্রশাসনসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত। তাই এসব প্রতিষ্ঠানকে দলীয় স্বার্থের বাইরে রেখে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা জরুরি।
রিজভীর ভাষ্য, মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে দেশে ১৫ হাজার শিশু নিখোঁজ হওয়ার মতো ঘটনা উদ্বেগজনক। এসব ঘটনায় পুলিশ অনেক শিশুকে উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও এমন পরিস্থিতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সরকারবিরোধী কোনো মতপ্রকাশ করলেই কাউকে ধরে আনা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির আহ্বায়ক চিত্রনায়ক হেলাল খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। এ ছাড়া জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কামরুল আহসান, জাসাসের সদস্যসচিব জাকির হোসেন রোকন, বিএনপির সহসাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক সাইদ সোহরাব, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর শরাফত আলী সফু, গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক শামিমুর রহমান শামিমসহ অনেকে বক্তব্য দেন।
এসি/আপ্র/০৮/০৯/২০২৬