গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৭ মার্চ ২০২৬

মেনু

ইতিহাসের প্রশ্নে দ্বন্দ্ব নয়

৭ মার্চকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১২:০৪ পিএম, ০৭ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৩:০০ এএম ২০২৬
৭ মার্চকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন
ছবি

৭ মার্চকে ঘিরে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত রয়েছে, যেগুলো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; বরং সমগ্র জাতির সম্মিলিত অর্জন। মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং তার সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো তেমনই এক ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণ বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক সন্ধিক্ষণ, যা স্বাধীনতার সংগ্রামকে সুসংগঠিত ও অনিবার্য পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তাই এই দিনকে ঘিরে বিভাজন নয়, বরং একটি অভিন্ন জাতীয় উপলব্ধি গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাঁর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি এবং ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত একটি জাতিকে চূড়ান্ত সংগ্রামের পথে আহ্বান করেছিল। একই সঙ্গে এটিও ইতিহাসের অংশ যে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে মেজর জিয়াউর রহমান কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করে মুক্তিযুদ্ধের লড়াইকে সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই দুই সত্যকে অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ সম্ভব নয়।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, স্বাধীনতা-পরবর্তী দীর্ঘ সময় ধরে দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠেছে। 
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি-এর মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ অনেক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঐতিহাসিকভাবে মীমাংসিত ঘটনাগুলোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিহাসের একটি বিভক্ত বয়ান হাজির হয়েছে, যা জাতীয় চেতনার জন্য মোটেও সহায়ক নয়।

বাস্তবে মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক দল বা ব্যক্তির একক অর্জন নয়; এটি সমগ্র জাতির সম্মিলিত সংগ্রাম। লাখো শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার সাহসিকতা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেই স্বাধীনতার পথ সুগম হয়েছিল। তাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হলে সেই ইতিহাসের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাবলিও এই সত্যকে নতুনভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ও ভাস্কর্যের ওপর হামলার ঘটনা জাতিকে উদ্বিগ্ন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক ধ্বংস করার মধ্যে কোনোভাবেই মুক্তিকামী চেতনার প্রকাশ ঘটে না। বরং এতে স্বাধীনতার ইতিহাস ও রাষ্ট্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল আবারো প্রমাণ করেছে যে, দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনও মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে দৃঢ়ভাবে ঐক্যবদ্ধ। নির্বাচনে জয়ী হওয়া বিএনপির জন্য এই বার্তাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে দলটির ওপর একটি বৃহত্তর জাতীয় দায়িত্বও বর্তায়-মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে নিয়ে বিভাজন নয়, বরং ঐক্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তাঁর দলের নীতিনির্ধারকদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। তারা যদি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর অবদানকে যথাযথ মর্যাদা দেন এবং একই সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ভূমিকারও স্বীকৃতি বজায় রাখেন, তাহলে জাতীয় ইতিহাসের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। একইভাবে অতীতে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকেও জিয়াউর রহমানের অবদানকে অস্বীকার করার প্রবণতা রাজনৈতিক বিভাজনকে তীব্র করেছে-এ বাস্তবতাও অস্বীকার করা যাবে না।

অতএব ইতিহাসের প্রশ্নে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখা কোনো দলের জন্যই শেষ পর্যন্ত লাভজনক নয়। বরং এতে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি দুর্বল হয় এবং চরমপন্থী শক্তি সুযোগ পায়। একটি স্থিতিশীল ও অগ্রসর বাংলাদেশ গড়তে হলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি অভিন্ন জাতীয় বোঝাপড়া গড়ে তোলা জরুরি।

৭ মার্চ, ২৫ মার্চ, ২৬ মার্চ এবং ১৬ ডিসেম্বর ও ১৬ ডিসেম্বর-এই প্রতিটি দিনই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলোকে দলীয় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসকে সম্মান জানানো মানে কেবল অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার নানা সূচকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি পারস্পরিক অবিশ্বাস ও ইতিহাস নিয়ে দ্বন্দ্ব অব্যাহত থাকে, তাহলে সেই অগ্রগতি স্থায়ী ভিত্তি পাবে না। তাই সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সহনশীলতার চর্চা শুরু করার।

ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করে, বিভাজনের রাজনীতি পরিহার করে এবং ৭ মার্চের চেতনায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই হতে পারে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তি। 
সানা/আপ্র/৭/৩/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য
০৬ মার্চ ২০২৬

প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য

জনস্বাস্থ্যের নীরব বিপদ ‘সুপারবাগ’

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার
০৪ মার্চ ২০২৬

প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তাই হোক সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধাবস্থা

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থামাতে বিশ্ববিবেকের জাগরণ চাই
০৩ মার্চ ২০২৬

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন থামাতে বিশ্ববিবেকের জাগরণ চাই

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যে আগুন জ্বলছে, তা কেবল একটি দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়-তা আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ...

ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নৈতিক দায়
০২ মার্চ ২০২৬

ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের নৈতিক দায়

মার্চের মাটিতে লেখা আত্মত্যাগের মহাকাব্য

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই