গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেনু

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৫:৫৮ পিএম, ০৪ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫৫ এএম ২০২৬
স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা
ছবি

প্রতিনিধিত্বকারী ছবি

একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা জনকল্যাণমুখী-তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হলো সেখানে সংবাদমাধ্যম কতটা স্বাধীন। কারণ গণতন্ত্র কেবল নির্বাচননির্ভর কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার, ক্ষমতার জবাবদিহি এবং নাগরিক মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। আর এই প্রক্রিয়ার প্রাণশক্তি হলো স্বাধীন সাংবাদিকতা। যে রাষ্ট্রে সাংবাদিকরা ভয়, মামলা, হামলা কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা ছাড়াই সত্য অনুসন্ধান করতে পারেন, সেই রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র ও কল্যাণের পথে এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস। নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের এক শ দিন পর প্রকাশিত তাদের পর্যবেক্ষণ ও দশ দফা সুপারিশ কেবল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মতামত নয়; বরং দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ, আইনের শাসন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কে বহির্বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন। এই বার্তাকে অস্বস্তিকর সমালোচনা হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে রাষ্ট্রীয় প্রজ্ঞার পরিচয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি অংশকে রাজনৈতিক পরিচয়ের ছকে বিচার করার প্রবণতা গড়ে উঠেছে। কখনো মামলা, কখনো গ্রেফতার, কখনো সামাজিক অপমান, কখনো বা পেশাগত বঞ্চনার মাধ্যমে সংবাদকর্মীদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ সামনে এসেছে। ফলে সংবাদমাধ্যমকে অনেক সময় সত্য অনুসন্ধানের প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এ প্রবণতা শুধু সাংবাদিকতার জন্য নয়, রাষ্ট্রের জন্যও বিপজ্জনক। কারণ স্বাধীন সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্ত হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের জানার অধিকার।

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাংবাদিকের কলমকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখা উচিত। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ কিংবা ক্ষমতাসীনদের সিদ্ধান্তের মূল্যায়ন কোনো অপরাধ নয়; বরং এগুলোই সুশাসনের অপরিহার্য উপাদান। যে রাষ্ট্র সমালোচনাকে ভয় পায়, সে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আত্মসমালোচনার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। আর আত্মসমালোচনাহীন রাষ্ট্র কখনো দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।

এ কারণেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার, ফৌজদারি আইনের অপব্যবহার বন্ধ, সাইবার ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনের বিতর্কিত ধারাগুলোর সংস্কার, হয়রানিমূলক নজরদারির অবসান এবং মব সহিংসতা থেকে সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আইনের প্রয়োগ কখনোই রাজনৈতিক পরিচয়নির্ভর হতে পারে না; তা হতে হবে ন্যায়, সমতা ও সংবিধানের চেতনার ভিত্তিতে।

গণমাধ্যম সংস্কারের প্রশ্নেও সরকারকে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বিকশিত হবে, তথ্যপ্রবাহ অবাধ থাকবে এবং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন শক্তিশালী হবে। কারণ গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করা যায় না।

বাংলাদেশ আজ উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এই যাত্রাপথে স্বাধীন সাংবাদিকতা কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি রাষ্ট্রের সুস্থ বিকাশের মৌলিক শর্ত। গণতন্ত্রকে কার্যকর, প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহিমূলক এবং উন্নয়নকে জনমুখী করতে হলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতেই হবে। কারণ ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট-স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র শক্তিশালী হয়, আর গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তির ওপরই নির্মিত হয় একটি সত্যিকারের কল্যাণ রাষ্ট্র।
সানা/আপ্র/৪/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ
০৩ জুন ২০২৬

প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ

তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক...

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?
০২ জুন ২০২৬

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, শাস্তি দেয় রাষ্ট্র, আর নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব ব...

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি, আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে এক নৈতিক অঙ্গীকার
২৭ মে ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহা ও কোরবানি, আনুষ্ঠানিকতার ঊর্ধ্বে এক নৈতিক অঙ্গীকার

পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জীবনে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি আত্মত্যাগ, আত্মশুদ্ধি, আনুগত্য,...

শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে আপসহীন
২৫ মে ২০২৬

শিশুর নিরাপত্তা প্রশ্নে রাষ্ট্রকে হতে হবে আপসহীন

একটি সভ্য রাষ্ট্রের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তার সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় নাগরিকদের নিরাপত্তা দিয়ে। সেই বিব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই