ঘি আমাদের উপমহাদেশের খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভাত, খিচুড়ি, ডাল কিংবা নানা রান্নায় এক চামচ ঘি অনেকের কাছেই স্বাদ ও পুষ্টির প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে এসেছে-ঘি কি কোলেস্টেরল বাড়ায়? হৃদ্রোগের ঝুঁকি কি বাড়ে? নাকি পরিমিত ঘি শরীরের জন্য উপকারী?
সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও পুষ্টিবিদদের মতামত বলছে, এ প্রশ্নের উত্তর সাদা-কালো নয়। ঘি যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিগুণ বহন করে, তেমনি অতিরিক্ত খেলে তা স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। তাই ঘিকে ‘অমৃত’ কিংবা ‘বিষ’-কোনোটিই বলা যাবে না। মূল বিষয় হলো পরিমাণ, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাস।
ঘি আসলে কী: ঘি তৈরি হয় মাখনকে ধীরে ধীরে গরম করে তার জলীয় অংশ ও দুধের কঠিন উপাদান আলাদা করার মাধ্যমে। ফলে এতে মূলত বিশুদ্ধ দুগ্ধজাত চর্বি থাকে। ঘিতে ভিটামিন ‘এ’, ‘ডি’, ‘ই’ ও ‘কে’ রয়েছে, যা শরীরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে। পাশাপাশি এতে অল্প পরিমাণে এমন কিছু উপাদানও থাকে, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
ঘি-এর উপকারিতা: পরিমিত পরিমাণে ঘি খাওয়ার কয়েকটি সম্ভাব্য উপকারিতা রয়েছে-
* ভিটামিন ‘এ’ চোখ, ত্বক ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো রাখতে সহায়তা করে।
* ভিটামিন ‘ডি’ হাড় ও দাঁতের স্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ।
* ভিটামিন ‘ই’ একটি শক্তিশালী প্রতিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কোষকে সুরক্ষা দেয়।
* ভিটামিন ‘কে’ রক্ত জমাট বাঁধা ও হাড়ের স্বাস্থ্যে ভূমিকা রাখে।
* উচ্চ তাপে রান্নার জন্য ঘি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, ফলে সহজে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হয় না।
তবে এসব উপকারিতা তখনই পাওয়া যায়, যখন ঘি পরিমিত মাত্রায় খাওয়া হয় এবং খাদ্যতালিকার অন্যান্য অংশও সুষম থাকে।
কোথায় রয়েছে ঝুঁকি: ঘির সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে **স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত চর্বি** এবং ক্যালোরির পরিমাণ বেশি। অতিরিক্ত ঘি খেলে অনেকের শরীরে ক্ষতিকর নিম্নঘনত্বের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন এমনটি চললে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক ও রক্তনালির জটিলতার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ঘি খাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাই চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া বেশি ঘি খাওয়া উচিত নয়।
তাহলে কি ঘি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, না। সুস্থ মানুষের জন্য পরিমিত পরিমাণে ঘি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। বরং খাদ্যতালিকার অধিকাংশ চর্বি যদি আসে মাছ, বাদাম, বীজ, জলপাই, সরিষা বা অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেল থেকে এবং জীবনযাপন সক্রিয় হয়, তাহলে অল্প পরিমাণ ঘি সাধারণত বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না।
অন্যদিকে প্রতিদিন অতিরিক্ত ঘি, মাখন, চর্বিযুক্ত মাংস ও ভাজাপোড়া একসঙ্গে খেলে মোট সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেড়ে যায়, যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি:
* ঘি কখনোই স্বাস্থ্যকর খাদ্যের বিকল্প নয়; এটি খাদ্যতালিকার একটি ছোট অংশ মাত্র।
* পরিমাণ নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
* নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুষম খাদ্যাভ্যাস ছাড়া শুধু ঘি কমিয়ে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব নয়।
* যাদের কোলেস্টেরল বা হৃদ্রোগের সমস্যা রয়েছে, তারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঘি গ্রহণ করবেন।
শেষ কথা: ঘি নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা হলো-এটি হয় সম্পূর্ণ ক্ষতিকর, নয়তো সম্পূর্ণ উপকারী। বাস্তবে কোনোটিই পুরোপুরি সত্য নয়। বিজ্ঞান বলছে, ঘির উপকারিতা যেমন আছে, তেমনি অতিরিক্ত গ্রহণের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর জীবনের মূলমন্ত্র একটিই-পরিমিতি, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম। ঘি খেতে চাইলে ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা।
সূত্র: বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুষ্টি গবেষণা, পুষ্টিবিদদের মতামত এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা।
সানা/আপ্র/২২/৭/২০২৬