গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

মেনু

মবের অন্ধকারে আইনের শাসনের কঠিন পরীক্ষা

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৮:৪৫ পিএম, ২০ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৪:০১ এএম ২০২৬
মবের অন্ধকারে আইনের শাসনের কঠিন পরীক্ষা
ছবি

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটির সর্বশেষ মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন শুধু একটি পরিসংখ্যান হাজির করেনি; এটি রাষ্ট্রের সামনে এক কঠিন সতর্কসংকেত উন্মোচন করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মব সহিংসতার ২৬৩টি ঘটনায় ১৩৫ জনের মৃত্যু এবং ২৫৬ জনের আহত হওয়ার তথ্য প্রমাণ করে, আইনকে পাশ কাটিয়ে জনতার হাতে বিচার তুলে নেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। আরো উদ্বেগের বিষয়, দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরাও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে গণপিটুনি, জনতার বিচার এবং বিচারবহির্ভূত সহিংসতার প্রবণতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। এই উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, সামাজিক অস্থিরতা এবং রাষ্ট্রীয় রূপান্তরের নানা পর্যায়ে মব সহিংসতার ঘটনা জনপরিসরে ক্রমেই দৃশ্যমান হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হয়েছিল, সেই সময় থেকে এই সংস্কৃতির বিস্তার নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। আজ জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের সময়েও যদি সেই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। কারণ, সরকার বদলালেও রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি বদলায় না; আইনের শাসন, নাগরিকের জীবনরক্ষা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা নিশ্চিত করা প্রতিটি সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

মবের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, এটি অপরাধ দমনের ছদ্মাবরণে সমাজকে আইনের পরিবর্তে আবেগ, গুজব ও প্রতিশোধের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। একবার যদি জনতার বিচারকে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়া শুরু হয়, তবে কে অপরাধী আর কে নির্দোষ-সেই সিদ্ধান্তও জনতার ক্ষণিক উত্তেজনার ওপর নির্ভর করবে। তখন আদালত, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নের মুখে পড়বে। সভ্য সমাজে এমন পরিস্থিতির কোনো স্থান নেই।

মব কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়, কোনো ন্যায়বিচারের পথও নয়। এটি সভ্যতার বিপরীত এক সহিংস সংস্কৃতি, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে দুর্বল করে এবং সমাজে ভয়, অবিশ্বাস ও প্রতিশোধের চক্রকে স্থায়ী করে। বিশ্বের বহু দেশে দেখা গেছে, যখন আইন দুর্বল হয় এবং জনতার হাতে বিচার চলে যায়, তখন তা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক সংঘাত, গোষ্ঠীগত প্রতিহিংসা এবং রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতার জন্ম দেয়। বাংলাদেশকে সেই বিপজ্জনক পথে যেতে দেওয়া যায় না।

অতএব, এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ, প্রতিটি মব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং গুজবনির্ভর উসকানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট ভাষায় জানাতে হবে-কোনো অভিযোগ, যত গুরুতরই হোক, তার বিচার হবে আদালতে; জনতার হাতে নয়।

আইনের শাসনের বিকল্প কখনোই মব হতে পারে না। রাষ্ট্র যদি এই সংস্কৃতিকে এখনই দৃঢ় হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমাজে প্রতিশোধ, বিভাজন ও সংঘাতের এমন এক বিপজ্জনক আবর্ত তৈরি হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বৃহত্তর সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়াবে। তাই মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান গ্রহণ আজ শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ, সামাজিক স্থিতি এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি রক্ষার অনিবার্য শর্ত।
সানা/আপ্র/২০/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

জুলাইয়ের বিজয় বিভাজনের হাতিয়ার হতে পারে না
১৯ জুলাই ২০২৬

জুলাইয়ের বিজয় বিভাজনের হাতিয়ার হতে পারে না

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত জাতির গতিপথ বদলে দেয়। ২০২৪ সালের জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে তেমনই এক সন্ধিক্ষণ।...

বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যু, সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি
১৮ জুলাই ২০২৬

বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে মৃত্যু, সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি

বাতাস মানুষের জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে অপরিহার্য অনুষঙ্গ। সেই বাতাসই যখন মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তখন তা...

বারবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরির অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক
১৭ জুলাই ২০২৬

বারবার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা তৈরির অপসংস্কৃতি বন্ধ হোক

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে এসেও আমাদের একটি নির্ভুল, সর্বজনগ্রাহ্য ও চূড়ান্ত মুক্তিযোদ্ধার তালি...

সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক
১৭ জুলাই ২০২৬

সমর্থনের নামে প্রাণহানি নয়, সৌহার্দ্যপূর্ণ ক্রীড়াসংস্কৃতির বিজয় হোক

খেলা মানুষের জীবনে আনন্দের রং ছড়িয়ে দেয়। মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার অন...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই