গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মেনু

প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৬:৫১ পিএম, ০৩ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১৫:০৪ এএম ২০২৬
প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ
ছবি

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর দীর্ঘ পথচলার ধারাবাহিকতা -ফাইল ছবি

তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি। ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলন, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় এবং পরবর্তী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে যার উপস্থিতি ছিল দৃশ্যমান, তাঁর জীবন ও কর্ম আজ ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেও তিনি নিছক অতীতের কোনো চরিত্র নন; বরং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি রাজনৈতিক পাঠশালা, যার প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে নেতৃত্ব, ত্যাগ, সহনশীলতা, সাহস এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতার শিক্ষা।

তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর দীর্ঘ পথচলার ধারাবাহিকতা। ছাত্রনেতা থেকে জাতীয় নেতা, আন্দোলনের সংগঠক থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বশীল অংশীদার-প্রতিটি পর্যায়ে তিনি রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেছেন, আবার প্রতিকূল সময়েও কারাবরণ করেছেন। মতপার্থক্যের কারণে নিজ দলেও নানা সময়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রুতে পরিণত করার সংস্কৃতির পরিবর্তে তিনি গণতান্ত্রিক সহাবস্থান ও সংলাপের গুরুত্বেই আস্থা রেখেছেন। এ কারণেই তিনি কেবল একটি দলের নেতা নন; বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী ও অংশীদার।

তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী কিছু ঘটনা তাই জাতিকে স্বাভাবিকভাবেই ব্যথিত করেছে। একজন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, উনসত্তরের অগ্রসৈনিক এবং জাতীয় রাজনীতির বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্বের বিদায়ে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সর্বদলীয় সম্মানের যে পরিবেশ প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার কিছু অমিল দেখা গেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। বিশেষ করে জানাজাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিক্ষোভ কিংবা অপ্রয়োজনীয় বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য সুখকর বার্তা বহন করে না।

একজন মানুষের মৃত্যু, বিশেষত একজন জাতীয় নেতার মৃত্যু, কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হতে পারে না। মৃত্যুর মুহূর্তে দল, মত, আদর্শের বিভাজন অতিক্রম করে জাতির সম্মিলিত শ্রদ্ধাই হওয়া উচিত সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচায়ক। কারণ রাষ্ট্রের ইতিহাসে যাঁদের অবদান রয়েছে, তাঁদের মূল্যায়ন দলীয় অবস্থানের ভিত্তিতে নয়, জাতীয় অবদানের ভিত্তিতেই হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভক্তি, প্রতিহিংসা ও অসহিষ্ণুতার যে দীর্ঘ ছায়া ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে, তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু-পরবর্তী আলোচনাগুলো সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। এটি কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের জন্য নয়; সমগ্র রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্য আত্মসমালোচনার উপলক্ষ হওয়া উচিত। সরকার, রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান-সবার কাছেই জনগণের প্রত্যাশা হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে জাতীয় ব্যক্তিত্বদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হবে না।

আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়, প্রজ্ঞার রাজনীতি; বিভক্তির রাজনীতি নয়, সহমতের রাজনীতি। যে রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং মানবিক মর্যাদাকে ধারণ করে। তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতার অধিকারী হওয়া নয়; নেতৃত্ব মানে ইতিহাসের দায় বহন করা।

তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো হবে তখনই, যখন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরো সহনশীল, আরো মানবিক এবং আরো দায়িত্বশীল হয়ে উঠবে। যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হবে, শত্রু হিসেবে নয়। যখন জাতীয় স্বার্থ দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি যদি সেই পথ অনুসরণ করতে পারে, তবে তোফায়েল আহমেদের জীবন ও সংগ্রাম আগামী প্রজন্মের জন্য সত্যিই এক অনন্য রাজনৈতিক পাঠশালা হয়ে থাকবে।
সানা/আপ্র/৩/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

চট্টগ্রামের পানিতে জীবাণু, জরুরি নজরদারি প্রয়োজন
০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের পানিতে জীবাণু, জরুরি নজরদারি প্রয়োজন

পানি জীবনের অপরিহার্য উপাদান। সেই পানির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা মানে জনস্বাস্থ্যের মৌলিক নিরাপত্তা...

জননিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা
০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জননিরাপত্তা আজ সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা

রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব কী? নাগরিকের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অথচ আজ সেই মৌলিক ন...

‘বাংলার টেসলা’ বন্ধ নয়, চাই সুশৃঙ্খল রূপান্তর
০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

‘বাংলার টেসলা’ বন্ধ নয়, চাই সুশৃঙ্খল রূপান্তর

রাজধানীর সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবাধ বিস্তার এখন আর নিছক পরিবহন-সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনার গ...

ছিনতাইয়ের হ্যাঁচকায় বিপন্ন রাজধানীর নাগরিক জীবন, জননিরাপত্তার দায় কার?
৩১ আগস্ট ২০২৬

ছিনতাইয়ের হ্যাঁচকায় বিপন্ন রাজধানীর নাগরিক জীবন, জননিরাপত্তার দায় কার?

রাজধানীর রাস্তায় এখন ছিনতাই কেবল মানুষের অর্থ-সম্পদ কেড়ে নেওয়ার অপরাধ নয়; এটি নাগরিকের জীবন ও রাষ্ট্...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের বিল সংসদে

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ নামে নতুন একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠনের বিধান রেখে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন আইন, ২০২৬’-এর বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের চতুর্থ দিনে বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ সময় সংসদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। প্রিয় পাঠক, আপনি মনে করেন র‌্যাব বিলুপ্তির এই উদ্যোগ সঠিক?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 17 ঘন্টা আগে