’বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ প্রতিপাদ্য নিয়ে অবশেষে বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হলো অমর একুশে বইমেলা ২০২৬। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার গভীরতম আবেগের নাম অমর একুশে বইমেলা। এটি কেবল বই কেনাবেচার আয়োজন নয়; এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের উৎসব, মননের মিলনমেলা, ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমানের সংলাপ। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে চলা এই মেলা একুশের চেতনা ধারণ করে জাতিকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
এবারের বইমেলা বিশেষ এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং পরপরই পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ায় মেলার সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়। প্রকাশকদের মধ্যে এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও শেষ পর্যন্ত ফেব্রুয়ারিতে মেলার উদ্বোধন হওয়া নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। কারণ, একুশের মেলা ফেব্রুয়ারির বাইরে কল্পনা করা কঠিন।
রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় উদ্বোধন: ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টা ১৩ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণা করেন। এ সময় তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করেন। জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়; পবিত্র কোরআনসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠ এবং সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটি গাম্ভীর্য পায়।
সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা-র নেতৃত্বে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান পরিবেশিত হয়। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন মেলাটিকে তার ঐতিহাসিক শিকড়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে।
অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজমসহ বিশিষ্টজনেরা উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন।
এবারের আয়োজন: এবারের মেলায় অংশ নিয়েছে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি প্রতিষ্ঠান স্টল পেয়েছে। মোট ইউনিট সংখ্যা ১,০১৮। গত বছরের তুলনায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কিছুটা কম হলেও আয়োজনের পরিসর ও বৈচিত্র্যে ঘাটতি নেই।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্মুক্ত মঞ্চসংলগ্ন গাছতলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ৮৭টি লিটল ম্যাগাজিন স্টল বরাদ্দ পেয়েছে-যা তরুণ লেখক ও বিকল্প চিন্তার চর্চার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। শিশুচত্বরে রয়েছে ৬৩টি প্রতিষ্ঠান ও ১০৭টি ইউনিট, যা নতুন প্রজন্মকে বইয়ের সঙ্গে যুক্ত করার এক প্রশংসনীয় প্রয়াস।
চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: নির্বাচন-পরবর্তী সময় এবং রমজানের আগমুহূর্ত-এই বাস্তবতায় নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ। বইমেলা ঘিরে যানজট, নিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা সাংগঠনিক দুর্বলতা যেন উৎসবের আনন্দ ম্লান না করে-সেটি নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।
একই সঙ্গে প্রকাশকদের ন্যায্য বিক্রি, পাঠকদের স্বস্তিদায়ক পরিবেশ এবং মানসম্পন্ন নতুন বইয়ের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল যুগে যখন পাঠাভ্যাস নানা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন বইমেলাই হতে পারে নতুন পাঠক তৈরির প্রধান অনুঘটক।
বইমেলা কেন আমাদের প্রাণে: অমর একুশে বইমেলা আমাদের ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহন করে। এটি স্মরণ করিয়ে দেয়-ভাষার জন্য জীবন দেওয়া জাতি কখনো সাংস্কৃতিকভাবে দেউলিয়া হতে পারে না। এখানে নতুন কবির কাব্যগ্রন্থ যেমন স্থান পায়, তেমনি গবেষণা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, শিশুতোষ বই-সবই একসঙ্গে মেলে। মেলা মানেই কেবল কেনাবেচা নয়; এটি বুদ্ধিবিনিময়, মতপ্রকাশ ও সংস্কৃতির সম্মিলিত উদযাপন। তরুণ প্রজন্মের হাতে যখন নতুন বই পৌঁছে যায়, তখনই একুশের চেতনা সত্যিকার অর্থে সার্থক হয়।
আত্মার উৎসব: পরিবর্তিত সময়সূচি, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট কিংবা সামাজিক বাস্তবতা-সব কিছুর ঊর্ধ্বে অমর একুশে বইমেলা আমাদের আত্মার উৎসব। এবারের আয়োজনও যেন নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও প্রাণবন্ত অংশগ্রহণে সার্থক হয়ে ওঠে-এটাই প্রত্যাশা। ফেব্রুয়ারির বাতাসে বইয়ের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ুক, নতুন প্রজন্ম বইয়ের পাতায় খুঁজে পাক ভবিষ্যতের দিশা-এই হোক আমাদের একুশের অঙ্গীকার
সানা/আপ্র/২৮/২/২০২৬