বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। রোববার (২৪ মে) ব্যাংকটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জোবায়দুর রহমানের পদত্যাগের পরপরই তাকে স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
কোরবানির ঈদের আগে শেষ কর্মদিবস রোববার রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-২ (বিআরপিডি) থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো হয়। চিঠির অনুলিপি খুরশীদ আলমকেও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মো. আলাউদ্দিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ও ৪৭(৩) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে মো. খুরশীদ আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের স্বতন্ত্র পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
খুরশীদ আলম ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিন বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক ডেপুটি গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পান। তবে ওই বছরের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কর্মকর্তাদের চাপের মুখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন চার কর্মকর্তার সঙ্গে তাকেও পদত্যাগ করতে হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটে তাকে দেশের বৃহত্তম শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হলো।
একই দিনে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জোবায়দুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক ছুটিতে থাকা ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানও পরিচালনা পর্ষদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, চেয়ারম্যান পদত্যাগ করায় নির্ধারিত পর্ষদ সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। ব্যবস্থাপনা পরিচালকও পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। তবে তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের বিষয়ে পরবর্তী পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত হবে। তিনি জানান, খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান ও পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
ব্যাংক সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের পরিচালনা ও নীতিনির্ধারণসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল। এ অবস্থায় চেয়ারম্যান দীর্ঘ সময় বিদেশে ছুটিতে ছিলেন। একই সময়ে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকেও ছুটিতে পাঠানো হয়।
রোববার রাজধানীর দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পরিচালনা পর্ষদের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরামের আন্দোলনের মুখে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়নি। এ সময় কিছু গ্রাহক ও কর্মকর্তা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদত্যাগ দাবি করেন। আন্দোলনকারীদের বাধার মুখে ওমর ফারুক খান প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করতে না পেরে পরে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।
এদিকে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেনসহ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকে তলব করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির পরিচালনা কাঠামো পুনর্গঠন শুরু করে।
ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ইসলামী ব্যাংকের মুনাফা ছিল প্রায় ৪৪৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে ১৩৭ কোটি টাকায় নেমে আসে। একই সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় ৪৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বর্তমানে ব্যাংকটি ৯২ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত।
এ ছাড়া ব্যাংকটির শেয়ারধারণ কাঠামোতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব ৬৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালের মার্চে ১৭ দশমিক ৯১ শতাংশে নেমে আসে। অন্যদিকে এস আলম গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংক জব্দ করেছে।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬