গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

মেনু

বৃষ্টি-বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত্যু ৪৪, দুর্ভোগে অন্তত ১০ লাখ মানুষ

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ১০:৫০ পিএম, ১২ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১১:৪৭ এএম ২০২৬
বৃষ্টি-বন্যা-পাহাড়ধসে মৃত্যু ৪৪, দুর্ভোগে অন্তত ১০ লাখ মানুষ
ছবি

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুড়ির দোকান এলাকায় বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়ক -ছবি বিডিনিউজের সৌজন্যে

টানা অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বন্যা ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৪ জনে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ এবং পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবার।

মন্ত্রণালয়ের শনিবার (১১ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত হালনাগাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাত জেলার ৫৮টি উপজেলার ৩৮৬টি ইউনিয়ন ও ১১টি পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে কক্সবাজারে। সেখানে বন্যা ও পাহাড়ধসে ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১০ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। জেলায় আহত হয়েছেন ২৪ জন। চট্টগ্রামে বন্যা ও দেয়ালধসে মারা গেছেন ১১ জন, আহত হয়েছেন ১২ জন। বান্দরবানে ঢল ও পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ২ জন। রাঙামাটিতে মারা গেছেন ৩ জন। মৌলভীবাজারে বন্যায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন।

ক্ষয়ক্ষতির দিক থেকেও সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম জেলা। জেলার ১৬টি উপজেলায় ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৫৩০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দি পরিবারের সংখ্যা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৬৪৮। কক্সবাজারে ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং পানিবন্দি হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার।

এ ছাড়া খাগড়াছড়ির ৯ উপজেলায় ২৭ হাজার ২২০ জন, রাঙামাটির ৯ উপজেলায় ৩ হাজার ৫২৪ জন, বান্দরবানের ৭ উপজেলায় ৮ হাজার ৩৫০ জন, মৌলভীবাজারের চার উপজেলায় ৩৮ হাজার ১৭২ জন এবং হবিগঞ্জের তিন উপজেলায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

চট্টগ্রাম বিভাগের পাঁচ জেলা—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, এসব জেলায় প্রায় ৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬১৪ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী ও প্রায় ১০ হাজার স্বেচ্ছাসেবক উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রমে কাজ করছেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানির নিচে। সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর বহু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও রান্নার জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র, আত্মীয়ের বাড়ি কিংবা টিনের ছাদে আশ্রয় নিয়েছে।

বাঁশখালীর বাহারছড়া, শেখেরখীল, কাথারিয়া, বড়ইতলী, গণ্ডামারা, ডোমরা, কদমরসূল, খানখানাবাদ, চাম্বল, ছনুয়া, সরল, রায়ছাটা ও পুঁইছড়িসহ উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় অসংখ্য কাঁচা ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। অনেক পাকা ও আধাপাকা বাড়ির নিচতলা কোমরসমান পানিতে ডুবে রয়েছে।

বন্যার করাল থাবায় স্বজন ও সহায়সম্বল হারিয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন হাজারো মানুষ। চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নের রিনা আক্তার বলেন, এক রাতের পাহাড়ি ঢলে তাঁদের পাঁচ কক্ষের মাটির ঘর পুরোপুরি ধসে গেছে। ছোট সন্তানদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। এখন কোথায় থাকবেন, কী খাবেন—সেই অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে।

একই উপজেলার পাহাড়ি ঢলে ভেসে মারা গেছে শিশু মোহাম্মদ আশিক (৭) ও মোহাম্মদ মিরাজ (৩)। কয়েক দিন ধরে টানা বৃষ্টিতে ডুবে থাকা এলাকায় হঠাৎ নেমে আসা ঢল তাদের প্রাণ কেড়ে নেয়।

ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মানবিক সহায়তা হিসেবে দেশের ৬৪ জেলার জন্য ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ৬৫০ মেট্রিক টন চাল এবং ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম পেয়েছে ৭০০ মেট্রিক টন চাল ও ৪০ লাখ টাকা, কক্সবাজার ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের প্রতিটি জেলায় ৪০০ মেট্রিক টন চাল ও ২০ লাখ টাকা, মৌলভীবাজারে ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ মেট্রিক টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে দুর্গত এলাকার অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি। অনেক পরিবার শুকনা খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে রয়েছে।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত দুই দিনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কিছুটা কমলেও বান্দরবানের সাঙ্গু ও মাতামুহুরী, চট্টগ্রামের সাঙ্গু, মৌলভীবাজারের মনু, সুনামগঞ্জ ও সিলেটের কুশিয়ারা এবং নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীর কয়েকটি পয়েন্টে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকায় সাময়িক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ত্রাণের অভাব নয়, বরং কার্যকর সমন্বয়। বিশেষ করে সন্তানসম্ভবা নারী, শিশু, প্রবীণ ও অসুস্থ মানুষের কাছে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সানা/আপ্র/১২/৭/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

অঝোর বৃষ্টিতে জলমগ্ন ঢাকা, কিছু স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত
১২ জুলাই ২০২৬

অঝোর বৃষ্টিতে জলমগ্ন ঢাকা, কিছু স্কুলের পরীক্ষা স্থগিত

টানা অঝোর বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকা রোববার (১২ জুলাই) সকালে কার্যত জলাবদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে। শনিবার (১...

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই
১২ জুলাই ২০২৬

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই

সাবেক স্পিকার, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, বিশিষ্ট আইনজীবী ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জ...

মিরপুরে দুই মাস ধরে তীব্র পানিসংকট, বাসা ছাড়ছেন ভাড়াটিয়ারা
১২ জুলাই ২০২৬

মিরপুরে দুই মাস ধরে তীব্র পানিসংকট, বাসা ছাড়ছেন ভাড়াটিয়ারা

রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এলাকায় তীব্র পানিসংকট এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা দুই মাস ধরে পর্যাপ্ত পানি ন...

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা, বিচ্ছিন্ন বহু জনপদ
১১ জুলাই ২০২৬

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা, বিচ্ছিন্ন বহু জনপদ

টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

বাক্প্রতিবন্ধী ববি বেগম হত্যায় গ্রেফতার পাঁচ, চলছে জিজ্ঞাসাবাদ

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে বাক্প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ববি বেগম নিহত হওয়ার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) সন্ধ্যা থেকে শুক্রবার (১০ জুলাই) সকাল পর্যন্ত নরসিংদী ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় যৌথ অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। প্রিয় পাঠক, আপনি কি মনে করেন যে, এই আসামিদের যথাযথ বিচারের আওতায় এনে বৃদ্ধা হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে