একেএম ফজলুল হক: টানা চার দিনের ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের জনজীবন। নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে পানি ঢুকে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। এর মধ্যে পৃথক পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বুধবার (৮ জুলাই) চট্টগ্রাম জেলায় অনুষ্ঠিতব্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। নগরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে। নিচু এলাকার অনেক বাসায় রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অচল হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিচতলার বাসিন্দারা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২৩৭ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিন আরো বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এদিকে বুধবার (৮ জুলাই) নগরের ষোলশহর মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় এবং সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সীতাকুণ্ড থানার জঙ্গল সলিমপুরের খেজুরতলা সংলগ্ন বাগানবাড়ি এলাকায় সকালে পাহাড়ের মাটি ধসে ১০ মাস বয়সী শিশু আশরাফুল ইসলাম তানভীর মারা যায়। সে ওই এলাকার মাহিন উদ্দিনের ছেলে। এ ঘটনায় শিশুটির মা আহত হয়েছেন।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, বুধবার সকাল ১০টার দিকে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে মাহিন উদ্দিনের ঘরের ওপর পড়ে। এ সময় ঘরের ভেতরে থাকা তানভীর মাটিচাপা পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মহিনুল ইসলাম জানান, পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা প্রক্রিয়াধীন।
অন্যদিকে নগরের পাঁচলাইশ থানাধীন ষোলশহর মেয়রগলি মুক্তিযোদ্ধা পাহাড় এলাকায় ভূমিধসে মারা গেছে ১১ বছর বয়সী শিশু সুমাইয়া আকতার। দুপুরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহেদুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ধসে ঘরের ওপর মাটি পড়ে শিশুটি আহত হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক মানুষের বসতি। এসব বসতির অধিকাংশই ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকে। এর আগে মঙ্গলবার নগরের ষোলশহর ও রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড় ও দেয়ালধসে আরো দুইজনের মৃত্যু হয়।
পানিবন্দি নগরবাসী: সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার এক নম্বর সড়ক, কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কোমরসমান পানি জমেছে। পানির তোড়ে অনেক এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়েছে। কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকার একটি ভবনের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ সেলিম জানান, জলাবদ্ধতার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। জেনারেটরের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কোমরসমান পানি মাড়িয়ে তেল আনতে যেতে হয়েছে তাকে।
চকবাজারের উর্দু গলি, হাসমত উল্লাহ মুন্সেফ লেইন, তেলিপট্টি, চক সুপার মার্কেট ও কাপাসগোলা এলাকায় পানির প্রবাহ তীব্র হয়েছে। কোথাও কোথাও স্রোতের কারণে মানুষের চলাচল কমে গেছে, বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল।
চট্টগ্রাম-হাটহাজারী সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। ইপিজেড এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমেছে। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকায় পানি উঠেছে কোমর পর্যন্ত।
চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা, ফরিদারপাড়া, শমসেরপাড়া, শুলকবহরের আব্দুল লতিফ সড়কসহ নগরের বিভিন্ন এলাকা পানির নিচে রয়েছে। অনেক বাসার নিচতলায় পানি ঢুকে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হয়েছে।
নতুন করে সিডিএ এক নম্বর, সিটি গেট, জামালখানের হেমসেন লেন, নাসিরাবাদ মহিলা কলেজ এলাকা, জিইসি মোড়, ফয়’স লেক, গরিব উল্লাহ শাহ মাজার এলাকা ও ইস্পাহানি রেলগেট এলাকাতেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।
প্রকল্পের পরও কাটেনি জলাবদ্ধতা: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড যৌথভাবে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পগুলোর বড় অংশের কাজ শেষ হলেও ভারী বৃষ্টিতে আগের মতোই নগরের বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, এটি একটি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এক দিনে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে যেকোনো শহরেই জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, কোনো সংস্থাকে দোষারোপ না করে সিটি করপোরেশন, সিডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোর সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন মেগা প্রকল্পের অধিকাংশ কাজ শেষ হয়েছে। স্লুইস গেট ও রেগুলেটরগুলো পানি অপসারণে কাজ করছে। তবে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত সামাল দেওয়া যেকোনো আধুনিক শহরের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের সহকারী পূর্বাভাস কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ চৌধুরী জানান, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী দুই দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি থাকায় প্রয়োজন ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পাহাড়ধসের সতর্কতাও জারি রয়েছে।
সানা/আপ্র/৯/৭/২০২৬