কুমিল্লার মহাসড়কের পাশে কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি পরিকল্পিত ছিনতাইয়ের নির্মম পরিণতি-এমন তথ্য জানিয়েছে র্যাব। সংস্থাটির ভাষ্য, অস্ত্রের মুখে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার পর চলন্ত অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয় তাকে; আর তাতেই ঘটে মর্মান্তিক এই মৃত্যু।
ঢাকার কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সোমবার (২৭ এপ্রিল) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ এম সাজ্জাদ হোসেন জানান, ঘটনার রাতে একটি ছিনতাইকারী চক্র অটোরিকশাসহ ওত পেতে ছিল। বাস থেকে নামার পর চালক ও যাত্রীবেশে থাকা তিনজনের ডাকে সাড়া দিয়ে বুলেট বৈরাগী অটোরিকশায় ওঠেন। এরপরই শুরু হয় ভয়ংকর সেই অধ্যায়।
র্যাব জানায়, অটোরিকশা চলতে শুরু করলে যাত্রীবেশে থাকা ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাকে আঘাত করে এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকে। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তারা তার কাছে থাকা নগদ অর্থ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মালামাল ছিনিয়ে নেয়। পরে কোটবাড়ি বিশ্বরোড অতিক্রম করার সময় তাকে চলন্ত অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়। প্রথমে অস্ত্রের আঘাত এবং পরে সড়কে পড়ে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পাওয়ায় তার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে র্যাব। তারা হলেন-মো. সোহাগ, ইসমাইল হোসেন জনি, ইমরান হোসেন হৃদয়, রাহাত হোসেন জুয়েল ও সুজন। রোববার কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। র্যাবের দাবি, তারা সবাই পেশাদার ছিনতাইকারী এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত একাধিক মামলা রয়েছে। গ্রেফতার সুজনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে নিহতের মোবাইল ফোন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে দূরপাল্লার যাত্রীদের নিশানা বানিয়ে আসছিল। গভীর রাতে তারা যাত্রীদের অটোরিকশা বা সিএনজিতে তুলে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই ও ডাকাতি চালাত। ঘটনার রাতে তারা কুমিল্লার জাগরঝুলি এলাকায় ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছিল।
তদন্তে জানা যায়, রাত প্রায় ৩টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে এসে জাগরঝুলিতে বাস থেকে নামেন বুলেট বৈরাগী। তার গন্তব্য জানতে চাইলে তিনি জাঙ্গালিয়া যাওয়ার কথা বলেন। তখন যাত্রীবেশে থাকা দুজন তাকে পাশে বসতে বলে অটোরিকশায় তুলে নেয়। এরপরই তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
এর আগে, চট্টগ্রামে প্রশিক্ষণ শেষে শুক্রবার রাতে কুমিল্লায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন ৩৫ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা। পরদিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোটবাড়ি এলাকার একটি হোটেলের পাশের ফুটপাত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তার মাথার পেছনে গুরুতর থেঁতলানো জখম ছিল।
বুলেট বৈরাগী কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগের সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন। গত ১১ এপ্রিল তিনি ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে যান।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শুক্রবার রাত ১১টার দিকে চট্টগ্রামের অলঙ্কার মোড় থেকে ঢাকাগামী বাসে ওঠেন তিনি। কুমিল্লা বাইপাসে নামার কথা থাকলেও সর্বশেষ রাত ২টা ২৫ মিনিটে ফোন করে তিনি নগরীর টমসন ব্রিজ চৌরাস্তার মোড়ে পৌঁছানোর কথা জানান। তবে সেই সময় তার কণ্ঠ ‘অপরিচিত’ মনে হয়েছিল বলে জানান তার মা নীলিমা বৈরাগী।
এরপর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তিনি বাড়ি না ফেরায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে খোঁজাখুঁজির পর শনিবার সকালে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। এর অল্প সময়ের মধ্যেই মহাসড়কের পাশ থেকে তার মরদেহ উদ্ধারের খবর আসে।
কেন তিনি নির্ধারিত স্টপেজে না নেমে জাগরঝুলিতে নেমেছিলেন-এই প্রশ্নে র্যাবের অধিনায়ক বলেন, গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় স্টেশন পার হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ তিনি নিজেই বলতে পারতেন।
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার ডুমুরিয়া বাবুপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বুলেট বৈরাগী ৪১তম বিসিএসে নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন। চাকরির সুবাদে কুমিল্লা শহরের রাজগঞ্জ সংলগ্ন পানপট্টি এলাকায় পরিবারসহ বসবাস করতেন। তার পরিবারে রয়েছেন বাবা-মা, স্ত্রী এবং এক বছর বয়সী একটি সন্তান।
র্যাব জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করা হলেও চক্রটির সঙ্গে আরো সদস্য যুক্ত থাকতে পারে। তদন্তের পরবর্তী ধাপে সেই সংশ্লিষ্টতাও উন্মোচিত হবে।
সানা/আপ্র/২৭/৪/২০২৬