ফুটবল ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক কখনও থামে না। প্রজন্ম বদলায়, নায়ক বদলায়, পরিসংখ্যান বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কেবল পরিসংখ্যানের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকেন না; তাঁরা হয়ে ওঠেন একেকটি যুগের প্রতীক। লিওনেল মেসি তেমনই এক নাম। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলকে যিনি শুধু শাসনই করেননি, নতুন করে সংজ্ঞায়িতও করেছেন। আর ডালাসের এক রাতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে তিনি যেন সেই শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ককেও আরো এক ধাপ নিজের দিকে টেনে নিলেন।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি শুরু হয়েছিল হতাশা দিয়ে। পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে পারেননি মেসি। গ্যালারিতে নেমে এসেছিল নিস্তব্ধতা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড তখন হাতছানি দিচ্ছিল। কিন্তু ফুটবল যেন আরো বড় নাটকের জন্য মুহূর্তটি জমিয়ে রেখেছিল।
৩৮তম মিনিটে সেই অপেক্ষার অবসান। ফাকুন্দো মেদিনার পাস, থিয়াগো আলমাদার বুদ্ধিদীপ্ত ডামি আর তারপর মেসির চিরচেনা বাঁ পায়ের নিখুঁত ফিনিশিং। বল জালে জড়াতেই ইতিহাসের পাতায় নতুন নাম লেখা হয়ে গেল। ১৭তম বিশ্বকাপ গোল করে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসাকে ছাড়িয়ে এককভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।
কিন্তু সেদিনের গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ে আরেকটি গোল করে নিজের রেকর্ডকে আরো সমৃদ্ধ করেন তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৮-তে। একই সঙ্গে টানা ছয় বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করে ছুঁয়ে ফেলেন ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন ও ব্রাজিলের জাইরজিনিয়োর অনন্য কীর্তি।
এবারের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার প্রথম পাঁচ গোলের সবকটিই এসেছে মেসির পা থেকে। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে কোনো দলের প্রথম পাঁচ গোল একাই করার কীর্তি এর আগে দেখা গিয়েছিল মাত্র একবার।
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপে অভিষেকের সময় তিনি ছিলেন কিশোর। দুই দশক পরও বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত, সবচেয়ে কার্যকর এবং সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলারদের একজন তিনিই। বয়স যখন ৩৯ ছুঁইছুঁই, তখনও প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম লিওনেল মেসি।
ক্যারিয়ারের শুরুতে আর্জেন্টিনার হয়ে শিরোপাহীনতার আক্ষেপ তাঁকে বারবার তাড়া করেছে। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হৃদয়ভাঙা পরাজয়, টানা কয়েকটি বড় টুর্নামেন্টে ব্যর্থতা এবং জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা—সবই তাঁর জীবনের অংশ। কিন্তু সেখান থেকেই আবার ফিরে এসেছেন তিনি। জিতেছেন মহাদেশীয় শিরোপা, জিতেছেন বিশ্বকাপ, জিতেছেন বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার।
ক্লাব ফুটবলেও তাঁর অর্জনের তালিকা বিস্ময়কর। অসংখ্য লিগ শিরোপা, ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ট্রফি, রেকর্ডসংখ্যক ব্যক্তিগত পুরস্কার এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ক্যারিয়ার। আটবার বিশ্বের সেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি পাওয়া এই মহাতারকা প্রায় প্রতিটি বড় রেকর্ডের সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে আছেন।
তবে মেসিকে শুধু সংখ্যা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁর মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে খেলার সৌন্দর্যে। প্রতিপক্ষের ভিড়ের মধ্যে বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষমতা, সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার শিল্প এবং ম্যাচের গতিপথ এক মুহূর্তে বদলে দেওয়ার দক্ষতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করার পরও তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং আরো শক্তভাবে ফিরে এসে ম্যাচের নায়ক হয়েছেন। এটাই সম্ভবত মেসির সবচেয়ে বড় পরিচয়। ব্যর্থতা তাঁকে থামাতে পারে না; বরং আরো বড় সাফল্যের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশ্বকাপে এখন তাঁর গোল ১৮। জাতীয় দলের হয়ে ২০১ ম্যাচে গোল ১২২। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি জয়, সবচেয়ে বেশি গোল, টানা ছয় ম্যাচে গোল, এক বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে পাঁচ গোল—রেকর্ডের তালিকা প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও মেসির অবস্থান আরো উঁচুতে।
কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি অনুভূতি। তিনি একটি যুগের নাম। তিনি সেই বিরল প্রতিভা, যাঁকে দেখে একাধিক প্রজন্ম ফুটবলের প্রেমে পড়েছে।
ফুটবলের ইতিহাসে অনেক রাজা এসেছেন, অনেক সম্রাটও। কিন্তু দুই দশক ধরে ধারাবাহিক শ্রেষ্ঠত্ব, অসংখ্য রেকর্ড, বিশ্বকাপ জয়ের গৌরব এবং এখনও বিশ্বমঞ্চে আধিপত্য—সবকিছু মিলিয়ে লিওনেল মেসি আজ এমন এক উচ্চতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে তাঁকে শুধু কিংবদন্তি বললে যেন কম বলা হয়।
তাই ডালাসের সেই রাত শুধু একটি রেকর্ডের রাত নয়। সেটি ছিল ফুটবল ইতিহাসের এক দীর্ঘ যাত্রার আরেকটি শিখর স্পর্শের মুহূর্ত। আর সেই মুহূর্ত নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে—শব্দ ফুরিয়ে যেতে পারে, রেকর্ড শেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু লিওনেল মেসি নামের বিস্ময় যেন ফুরায় না।
আজ তাই সমর্থকদের কণ্ঠে একটাই উচ্চারণ—সবাইকে ছাড়িয়ে, ফুটবলের আক্ষরিক রাজা মেসি।
সানা/আপ্র/২৩/৬/২০২৬