বিশেষ প্রতিনিধি: বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে বছরের পর বছর কর বৃদ্ধি ও নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে ধূমপানের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে না। বরং ধূমপানের ধরন বদলে যাচ্ছে-প্রিমিয়াম সিগারেট থেকে সস্তা ব্র্যান্ড, খুচরা শলাকা এবং দ্রুত বিস্তৃত ই-সিগারেট বা ভেপিংয়ের দিকে ঝুঁকছে তরুণরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু জনস্বাস্থ্য সংকট নয়; বরং তামাক নিয়ন্ত্রণ নীতির বাস্তব প্রয়োগ দুর্বলতারও স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কর বাড়লেও আচরণ বদলায়নি বেশিরভাগ তরুণ
‘ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট’-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেশের ৮টি বিভাগের ৩৯১ জন তরুণ ধূমপায়ীর ওপর বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে-
* ৭৯.২৮% তরুণ কর বৃদ্ধির পরও ধূমপানের পরিমাণ কমায়নি
* ৭৬.০৮% তরুণের দৈনিক সিগারেটের পরিমাণ অপরিবর্তিত
* ৩.২% তরুণের ধূমপান উল্টো বেড়েছে
* মাত্র ২০.৭২% তরুণ ধূমপান কিছুটা কমিয়েছে
অর্থাৎ করনীতি থাকলেও আচরণগত পরিবর্তন সীমিত।
সিগারেটের বাজারে ‘সস্তা ব্র্যান্ড’ প্রবণতা
গবেষণায় আরো দেখা যায়, দাম বাড়ার কারণে ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়েননি; বরং ব্র্যান্ড পরিবর্তন করেছেন-
* ২১.২৩% সরাসরি কম দামের ব্র্যান্ডে চলে গেছে
* ৫৮.৭৭% মাঝেমধ্যে সস্তা ব্র্যান্ড ব্যবহার করছে
* ৭২.৩৮% বাজারে নির্ধারিত এমআরপির চেয়ে বেশি দামে কিনছে
* ২৬% তরুণ এমআরপি সম্পর্কে জানেই না
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল বাজার নজরদারির কারণে কর বৃদ্ধির প্রভাব অনেকটাই “নিষ্ক্রিয়” হয়ে যাচ্ছে।
ধূমপানে ব্যয় মেটাতে কাটছাঁট নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে
গবেষণায় আরো উঠে এসেছে সামাজিক-অর্থনৈতিক চাপের চিত্র-
* ১৮.৬৭% তরুণ ধূমপানের জন্য অন্যান্য খরচ কমিয়েছে
* এর মধ্যে ৭৬.৭৬% খাদ্য, যাতায়াত ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে কাটছাঁট করেছে
* ২৩% পারিবারিক বাজেট থেকে অর্থ নিচ্ছে
* ১.২৪% শিক্ষা ও বিনোদন খরচ কমিয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য উদ্বেগজনক সংকেত।
ই-সিগারেট: নতুন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
তামাক নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে ই-সিগারেট বা ভেপিং।
* ২০১৭ সালে ব্যবহার ছিল ০.২%
* ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৭.৪২%
এছাড়া ৭.৯৩% তরুণ ধূমপানের পাশাপাশি ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা/গুল) ব্যবহার করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লেভারযুক্ত পণ্য, সহজ প্রাপ্যতা এবং সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণা তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
কেন ধূমপান কমে না: আচরণগত বিশ্লেষণ
যেসব তরুণ ধূমপান কমিয়েছে, তাদের মধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো-
* ৪১.৯৯% স্বাস্থ্য সচেতনতা
* ২৩.৮১% পাবলিক প্লেসে নিষেধাজ্ঞা
* ১৯.৮৮% আসক্তি কিছুটা কমে যাওয়া
* ১৪.৩২% অর্থনৈতিক চাপ
অর্থাৎ, আইন নয়-স্বাস্থ্য সচেতনতাই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞ মত: “কর বাড়ালেই তামাক নিয়ন্ত্রণ হয় না”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, তামাকজাত পণ্যের মতো আসক্তি তৈরি করা দ্রব্যে শুধু কর বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়। ভোক্তারা সহজেই সস্তা ব্র্যান্ড বা বিকল্প পণ্যে চলে যায়।
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, তামাক নিয়ন্ত্রণে তিনটি বিষয় একসঙ্গে জরুরি-
কঠোর আইন, কার্যকর প্রয়োগ এবং জনসচেতনতা।
নীতি কাঠামোর দুর্বলতা
বিশেষজ্ঞদের মতে বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান সমস্যা-
* জটিল স্তরভিত্তিক কর কাঠামো
* খুচরা শলাকা বিক্রি অব্যাহত
* এমআরপি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল
* ভেপিং নিয়ে কার্যকর আইন অনুপস্থিত
ফলে করনীতি আংশিক কার্যকর হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।
সামাজিক প্রভাব: নীরব আর্থিক চাপ
ধূমপানের কারণে তরুণদের মধ্যে-
* মৌলিক খরচ কমানোর প্রবণতা
* পরিবারিক আর্থিক চাপ বৃদ্ধি
* শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয়ে সংকোচন
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীল জনশক্তি গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
তামাক নিয়ন্ত্রণে তারা যেসব পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন-
* সহজ ও একক কর কাঠামো
* খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ
* ই-সিগারেট ও ভেপিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
* বাজার মনিটরিং ও শাস্তি জোরদার
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তামাকবিরোধী কার্যক্রম বৃদ্ধি
সংকটের সমাধান কোথায়
বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণে নীতি ও কর ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে ধূমপানের প্রবণতা কমছে না-বরং তা নতুন রূপ নিচ্ছে। সস্তা সিগারেট, ব্র্যান্ড পরিবর্তন এবং দ্রুত বাড়তে থাকা ই-সিগারেট তরুণদের নতুন ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন প্রয়োজন একক করনীতি নয়-বরং শক্তিশালী আইন, কঠোর প্রয়োগ এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতার সমন্বিত বাস্তবায়ন।
সানা/আপ্র/১৮/৬/২০২৬