বাংলাদেশের উত্তর জনপদের বিস্তীর্ণ চরভূমি-যেখানে নদীর স্রোত যেমন নির্মম, তেমনি জীবনের বাস্তবতাও কঠিন ও নির্দয়। সেই অবহেলিত ভূখণ্ডের বুক চিরে উঠে এসেছে এক কণ্ঠ, এক সরল উচ্চারণ-যা আজ ছুঁয়ে গেছে সারা দেশের মানুষের হৃদয়। তিনি তাইজুল ইসলাম, সবার প্রিয় “তাজু ভাই”।
কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের সরকারপাড়া গ্রাম-ব্রহ্মপুত্রের বুকে ভেসে থাকা এক নিভৃত জনপদ। সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা তাজু ভাইয়ের। ছয় ভাইবোনের সংসারে সবার বড় তিনি, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ। দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতা তাকে কোনোদিন বিদ্যালয়ের বারান্দায় দাঁড়াতে দেয়নি। জীবনের পাঠ তাই তাকে নিতে হয়েছে শ্রমের ঘামে, সংগ্রামের প্রতিটি দিন থেকে।
রাজধানীতে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাজ করেন তিনি। দিনভর ইট-সিমেন্টের ভার বইতে বইতেই তার জীবনের গল্প গড়ে ওঠে। কিন্তু সেই কঠিন জীবনের ভেতরেও তিনি খুঁজে নেন এক টুকরো আশ্রয়-মুঠোফোনের ছোট্ট পর্দায়। নিজের ভাষায়, “পরিবারের দুঃখকষ্ট ভুলতেই ভিডিও করি, আমি কোনো সাংবাদিক না।” অথচ এই অস্বীকারের আড়ালেই যেন লুকিয়ে আছে এক গভীর সত্য-তিনি সাংবাদিক নন, কিন্তু মানুষের জীবনের অপ্রকাশিত গল্পগুলোই তুলে ধরছেন নিঃসংকোচে।
মহান স্বাধীনতা দিবসে, ২৬ মার্চ, নারায়ণপুর বাজারে দাঁড়িয়ে তিনি ধারণ করেন একটি ভিডিও। বিষয়-জিলাপির দাম। প্রশ্নটি ছিল সহজ, ভাষা ছিল আঞ্চলিক, উপস্থাপনা ছিল একেবারেই অনাড়ম্বর-“জিলাপি আজকে কত করে বেচতেছেন সরকারি রেটে? সাদাডা কত, লালডা কত?” এই সরল উচ্চারণই যেন ছড়িয়ে পড়ে ঝড়ের গতিতে। কয়েক দিনের মধ্যেই ভিডিওটি দেখে ফেলেছে প্রায় পঞ্চাশ থেকে ঊনষাট লাখ মানুষ। মাত্র কয়েকদিনে ফেসবুকে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ছয় হাজার থেকে বেড়ে কয়েক লাখে পৌঁছেছে।
কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পথ ছিল কাঁটায় ভরা। কেউ ভালোবেসেছে তার সরলতাকে, আবার কেউ বিদ্রƒপ করেছে তার অপ্রস্তুত ভাষাকে। তবুও তাজু ভাইয়ের কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই। বরং তার কণ্ঠে ধরা পড়ে এক অনন্য মানবিকতা-“আমি বোকাসোকা মানুষ, ভুল হতেই পারে... আমি শুধু চাই চরের মানুষের উন্নয়ন হোক।” এই একটি বাক্য যেন বদলে দিয়েছে সবকিছু। উপহাস স্তব্ধ হয়েছে, হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে সহমর্মিতা।
তাজু ভাইয়ের ভিডিও কেবল বিনোদন নয়; এটি এক প্রান্তিক জনপদের জীবন্ত দলিল। যেখানে নেই পর্যাপ্ত নজর, নেই উন্নয়নের ছোঁয়া। তিনি নিজেই বলেছেন, তাদের এলাকায় সংবাদমাধ্যম খুব কম যায়। তাই নিজের মতো করে তিনি তুলে ধরতে চান সেই না-বলা গল্পগুলো-মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা, অবহেলার দীর্ঘ ইতিহাস।
আজ তাজু ভাই শুধু একটি ভাইরাল নাম নন; তিনি হয়ে উঠেছেন এক প্রতীক-অবহেলিত মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতীক। তার সরলতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, হৃদয় ছুঁতে জটিলতার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন সত্যিকারের অনুভূতি।
চরের মাটি থেকে উঠে আসা এই কণ্ঠ আমাদের সামনে এক গভীর সত্য তুলে ধরে-দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে লুকিয়ে আছে অসংখ্য না-বলা গল্প, অসংখ্য তাজু ভাই। শুধু দরকার তাদের শোনার কান, বোঝার মন।
সানা/আপ্র/৩১/৩/২০২৬