রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে হত্যার পর লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, হত্যার পর অপরাধ গোপন করতেই মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করা হয়।
মঙ্গলবার (১৯ মে) রাত সোয়া ১০টার দিকে পল্লবী থানায় আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম এ তথ্য জানান।
পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর–১১ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের ৭ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তিনতলার একটি ফ্ল্যাট থেকে রামিসার খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটির মাথা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় শৌচাগারে পাওয়া যায়। শরীরের বাকি অংশ উদ্ধার করা হয় খাটের নিচ থেকে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসার মা পারভীন আক্তার মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য খুঁজতে গিয়ে বাসার সামনে একটি জুতা দেখতে পান। এতে পাশের ফ্ল্যাটের প্রতি তাঁর সন্দেহ হয়। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তিনি ডাকাডাকি ও ধাক্কাধাক্কি শুরু করেন। একপর্যায়ে দরজা খুললে স্বপ্না আক্তারকে পাওয়া যায়। তবে প্রধান সন্দেহভাজন সোহেল রানা জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যান।
পুলিশ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার এবং বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন চালানো হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে আলামত সিআইডিতে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, মরদেহ সরিয়ে ফেলা ও অপরাধ গোপনের উদ্দেশ্যে লাশ খণ্ডবিখণ্ড করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে শিশুটির মা বিষয়টি টের পেয়ে যাওয়ায় পরিকল্পনা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি এবং অভিযুক্ত পালিয়ে যায়।
পরে সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সোহেল ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্নার বাড়ি নাটোর জেলার সিংড়ায় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, রামিসা স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তাঁর বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন। মা পারভীন আক্তার। দুই বোনের মধ্যে রামিসা ছিল ছোট। পরিবারটি প্রায় ১৭ বছর ধরে ওই বাসায় বসবাস করছে।
ঘটনার পর দুপুরে ওই বাড়ির সামনে উৎসুক মানুষের ভিড় দেখা যায়। বাসার ভেতরে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট আলামত সংগ্রহে কাজ করে। এ সময় রামিসার মা–বাবাকে বাক্রুদ্ধ অবস্থায় বসে থাকতে দেখা যায়।
রামিসার চাচা এ কে এম নজরুল ইসলাম জানান, বড় বোনের সঙ্গে স্কুলে যাওয়ার কথা থাকলেও সকালে রামিসাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে দরজার বাইরে তাঁর একটি জুতা পড়ে থাকতে দেখে পরিবারের সন্দেহ হয়। অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পরও পাশের ফ্ল্যাটের দরজা না খোলায় পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে লাশ উদ্ধার করে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার নজরুল ইসলাম বলেন, সোহেল রানার বিরুদ্ধে নাটোরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আগের একটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁর আচরণ ও স্ত্রীর প্রাথমিক বক্তব্যের ভিত্তিতে পুলিশ ধারণা করছে, তিনি বিকৃত মানসিকতা ও বিকৃত যৌনরুচির ব্যক্তি হতে পারেন। তবে ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।
স্বপ্না আক্তার পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তিনি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে ছিলেন এবং ঘটনার কিছু জানেন না। তবে তদন্তে দেখা গেছে, দরজায় ধাক্কাধাক্কির পরও দীর্ঘ সময় দরজা না খোলা এবং সোহেল রানাকে পালানোর সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সহযোগিতা করেছেন বলে পুলিশের ধারণা। রামিসার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
সানা/আপ্র/২০/৫/২০২৬