স্টেশন, টার্মিনাল আর ফেরিঘাট-সবখানেই এখন একটাই ছবি। ব্যাগ-লাগেজ হাতে ঘরমুখো মানুষের দীর্ঘ সারি, ক্লান্ত কিন্তু উচ্ছ্বসিত মুখে প্রিয়জনের কাছে ফেরার তাড়না। কেউ ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন, কেউ বাসের ছাদে বসে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছেন শহরকে। রাজধানী ঢাকা যেন ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে-নাড়ির টানে গ্রামে ফিরছে লাখো মানুষ।
অন্যদিকে পাড়া-মহল্লায় কোরবানির পশুকে ঘিরে জমে উঠেছে এক ভিন্ন আবহ। কোথাও উঠানে বাঁধা বিশাল গরু, কোথাও ছাগলের গলায় দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে শিশুদের উচ্ছ্বাস। কেউ দূর থেকে দেখে সাহস সঞ্চয় করছে, কেউ আবার কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দেখছে আসন্ন ত্যাগের প্রতীককে। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত এখন কোরবানির প্রস্তুতির চিরচেনা দৃশ্যই ছড়িয়ে পড়েছে।
আর মাত্র একদিন পরই পবিত্র ঈদুল আজহা। ত্যাগ, আত্মসমর্পণ, সহমর্মিতা ও মানবিকতার মহিমান্বিত বার্তা নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার (২৮ মে) উদযাপিত হবে মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বৃহত্তম এই ধর্মীয় উৎসব। ঈদকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এখন তুঙ্গে। কোরবানির পশু কেনা, হাটে ভিড়, বাড়ি ফেরা এবং ঈদের আয়োজন-সব মিলিয়ে দেশজুড়ে বিরাজ করছে উৎসবমুখর আবহ।
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বসেছে কোরবানির পশুর হাট। এসব হাটে চলছে জমজমাট বেচাকেনা। ক্রেতারা পরিবার নিয়ে পছন্দের পশু বাছাই করছেন, দরদামে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন বিক্রেতারা। ট্রাক, ভ্যান ও খোলা ট্রলিতে করে পশু পরিবহনের দৃশ্য এখন শহরের স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ঈদ উপলক্ষে রাজধানীসহ সারাদেশে নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঈদের জামাত নির্বিঘ্ন করতে মাঠ, ঈদগাহ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তা ও নাগরিক সেবা।
রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টায় অনুষ্ঠিত হবে দেশের প্রধান ঈদ জামাত। এতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, বিচারপতি, কূটনীতিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেবেন বলে প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে। জাতীয় ঈদগাহে প্রায় ৩৫ হাজার মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ১২১টি কাতার, অজুখানা, চিকিৎসা কেন্দ্র, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। আবহাওয়া প্রতিকূল হলে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হবে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে।
ঈদুল আজহা মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব, যা কোরবানির ঈদ নামেও পরিচিত। এর মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর অতুলনীয় আত্মত্যাগে। মহান আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিজের সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকেও উৎসর্গ করার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তাঁরা স্থাপন করেছিলেন, কোরবানি সেই চেতনারই প্রতীক।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, কোরবানি কেবল পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মানুষের ভেতরের অহংকার, লোভ, হিংসা, স্বার্থপরতা ও অন্যায়ের প্রবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়ার শিক্ষা। কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী, আল্লাহর কাছে পশুর রক্ত বা গোশত পৌঁছে না; পৌঁছে মানুষের তাকওয়া ও আন্তরিকতা।
ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি ঈদুল আজহা সমাজে সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এক অনন্য বার্তা নিয়ে আসে। কোরবানির মাংস আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যে বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে আনন্দ ভাগাভাগির যে দৃশ্য তৈরি হয়, তা এই উৎসবকে আরো মানবিক ও অর্থবহ করে তোলে।
এবারের ঈদুল আজহা জাতীয় জীবনেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের অধীনে এটিই প্রথম ঈদুল আজহা। দীর্ঘ সরকারি ছুটি, তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রা এবং ঈদ ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের বিশেষ প্রস্তুতি এবারের ঈদকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
ঈদের প্রস্তুতি যত এগোচ্ছে, ততই মানুষের মনে জমছে অন্যরকম আবেগ। প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের তাগিদে শহর ছাড়ছে লাখো মানুষ। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় উন্নতি ও প্রশাসনিক তৎপরতায় এবার ঈদযাত্রা তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক হচ্ছে বলেও যাত্রীরা জানিয়েছেন।
সব মিলিয়ে ঈদুল আজহা সামনে রেখে দেশজুড়ে বিরাজ করছে এক উৎসবমুখর, আবেগঘন ও প্রাণবন্ত পরিবেশ-যেখানে ত্যাগের শিক্ষা, ঘরমুখো মানুষের ঢল এবং কোরবানির প্রস্তুতি একসূত্রে মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য ঈদ-আবহ।
সানা/আপ্র/২৬/৫/২০২৬