গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ২৫ মে ২০২৬

মেনু

তীব্র গরম আর উত্তেজনার মধ্যে পবিত্র হজ শুরু

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩০ পিএম, ২৫ মে ২০২৬ | আপডেট: ২০:৩৬ এএম ২০২৬
তীব্র গরম আর উত্তেজনার মধ্যে পবিত্র হজ শুরু
ছবি

পবিত্র কাবা থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে তাঁবুর নগর মিনায় যাত্রা করেছেন হজযাত্রীরা -ছবি এএফপি

তীব্র গরম ও আঞ্চলিক যুদ্ধ-উত্তেজনা ঘিরে অনিশ্চয়তার আবহের মধ্যেই শুরু হয়েছে এবারের পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম। সোমবার (২৫ মে) থেকে সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলোতে হজের মূল কার্যক্রম শুরু হয়। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম এই ইবাদতে অংশ নিতে ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ১৫ লাখের বেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

হজের প্রথম ধাপ হিসেবে হজযাত্রীরা মক্কা থেকে মিনার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হজ ব্যবস্থাপনার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে এবং তাঁবু নগরী মিনায় হাজিদের অবস্থান, পরিবহন ও সেবা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ব্যবস্থা চালু রাখা হয়েছে। তালবিয়া ধ্বনিতে মুখরিত পরিবেশে দলে দলে হজযাত্রীরা মিনার দিকে রওনা দিচ্ছেন।

হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা জানান, ৮ জিলহজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে হজের মূল কার্যক্রম শুরু হয়েছে। হাজিরা মিনায় অবস্থান করবেন, এরপর ৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে মূল হজের সর্বোচ্চ আনুষ্ঠানিকতা পালন করবেন। পরে মুজদালিফায় রাত যাপন এবং মিনায় ফিরে শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম সম্পন্ন হবে।

সৌদি আরবের মক্কায় কাবা শরিফে ইতোমধ্যে তাওয়াফ সম্পন্ন করতে দেখা গেছে বহু হজযাত্রীকে। তীব্র গরমের কারণে অনেকেই ছাতা ব্যবহার করছেন, কেউ কেউ পানিশূন্যতা এড়াতে স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া পানি গ্রহণ করছেন। বড় বড় ফ্যান ও কুয়াশা ছিটানোর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে যাতে হজযাত্রীরা স্বস্তিতে ইবাদত করতে পারেন।

হজে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা জানান, এই আধ্যাত্মিক সফর তাদের জীবনের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। মিসর থেকে আগত এক হজযাত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তিনি এই সুযোগ পাওয়াকে আল্লাহর বিশেষ রহমত হিসেবে দেখছেন এবং গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

আঞ্চলিক উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এবারের হজকে ঘিরে নিরাপত্তা ও প্রস্তুতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। কিছু দেশের হজ কর্তৃপক্ষ আগেই জরুরি পরিকল্পনা ও অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ন্ত্রণে নির্দেশনা দিয়েছে। জ্বালানি খরচ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবও হজযাত্রীদের যাতায়াত ব্যয়ে পড়েছে বলে জানা গেছে।

বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ঘিরে উত্তেজনা বাড়লেও সৌদি আরব জানিয়েছে, হজ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

হজের সূচি অনুযায়ী আগামী দিনগুলোতে মিনায় অবস্থান, আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, মুজদালিফায় রাতযাপন, জামারাতে পাথর নিক্ষেপ এবং কাবা শরিফে তাওয়াফ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হবে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে হজকে আত্মশুদ্ধি, ক্ষমা প্রার্থনা ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ ইবাদত হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসলমানরা একই পোশাক, একই আহ্বান ও একই বিশ্বাসে একত্রিত হয়ে যে ঐক্যের প্রতীক তৈরি করেন, তা প্রতি বছরই হজকে বিশ্বমানবতার এক অনন্য সমাবেশে পরিণত করে। সূত্র: আরব নিউজ, সৌদি গেজেট

কয়েক দিন হজে কী কী করবেন হাজিরা: পবিত্র হজ সোমবার (২৫ মে) শুরু হয়েছে। গত রোববার দিবাগত রাত থেকে হজযাত্রীরা তাঁবুর নগর মিনায় যেতে শুরু করেছেন। হজযাত্রীদের মুখে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে তালবিয়ার দোয়া-‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্ক, লা শারিকা লাক...অর্থাৎ ‘আমি হাজির, হে আল্লাহ। আমি হাজির, আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, আমি হাজির, নিশ্চয়ই সব প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই, আর সব সাম্রাজ্যও তোমার, তোমার কোনো শরিক নেই।’

হজযাত্রীরা যাতে সুচারুভাবে হজের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেন, সে জন্য সৌদি আরব সরকার বিশাল স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন ও বহুভাষিক সেবা চালু করেছে। পবিত্র স্থানে আগামী কয়েক দিন হজযাত্রীদের হজের সময়সূচি বা কার্যক্রম কেমন হবে, তার একটি রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো।

১. মিনা
৮ জিলহজ: হজযাত্রীরা মক্কার গ্র্যান্ড মসজিদ (পবিত্র কাবা শরিফ) থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তাঁবুর নগরী মিনায় এসে পৌঁছান। তাঁরা মিনায় দিন–রাত কাটান এবং ইবাদত ও দোয়ায় মশগুল থাকেন।

২. আরাফাত
৯ জিলহজ: হজযাত্রীরা মিনা থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আরাফাতের উদ্দেশে রওনা হন। তাঁরা আরাফাতের মরুভূমির প্রান্তরে অবস্থান করেন এবং একই দিন সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রার্থনা ও তওবা (ক্ষমা প্রার্থনা) করতে থাকেন।

৩. মুজদালিফা
৯ জিলহজ: হজযাত্রীরা মিনা ও আরাফাত পর্বতের মধ্যবর্তী উপত্যকা মুজদালিফার দিকে রওনা হন। তাঁরা সেখানে রাত যাপন করেন এবং মিনার জামারাতে ‘শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারার’ জন্য ছোট ছোট পাথর সংগ্রহ করেন।

৪. মিনা
১০ জিলহজ: ভোরের (ফজরের) নামাজ পড়ার পর হাজিরা মুজদালিফা ত্যাগ করে মিনার দিকে রওনা হন। সেখানে তাঁরা জামারাত আল-আকাবায় (বড় শয়তানকে) প্রথম পাথর নিক্ষেপ করেন।

৫. গ্র্যান্ড মসজিদ (পবিত্র কাবা শরিফ)
১০ ও ১২ জিলহজ: হাজিরা মক্কায় ফিরে আসেন এবং গ্র্যান্ড মসজিদ বা পবিত্র কাবা শরিফের দিকে যান। তাঁরা তাওয়াফ আল-ইফাদাহ (কাবার চারপাশ প্রদক্ষিণ) এবং সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাঈ (দৌড়ানো) সম্পন্ন করেন।

৬. মিনা

১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ: হাজিরা তিন দিন ধরে জামারাতের তিনটি স্তম্ভেই (আল-উলা বা ছোট, আল-উস্তা বা মেজ এবং আল-আকাবা বা বড় শয়তান) পাথর নিক্ষেপ করেন। তাঁরা শয়তানের প্রতীকী তিনটি স্তম্ভে পাথর নিক্ষেপের জন্য আগে থেকে সংগ্রহ করে রাখা পাথরগুলো ব্যবহার করেন।

৭. পবিত্র মক্কা
হাজিরা মক্কার দিকে রওনা হন এবং বিদায়ী তাওয়াফ (তাওয়াফ আল-বিদা) সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমেই হজের সমাপ্তি ঘটে এবং হাজিরা চাইলে মক্কা ত্যাগ করতে পারেন।

সৌদিতে ২৭ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু: এবছর হজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৭ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন পুরুষ ও ৯ জন নারী। মৃতদের মধ্যে মক্কায় ১৮ জন এবং মদিনায় ৯ জন ইন্তেকাল করেছেন।

পবিত্র হজের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিশেষ সমন্বয় সভা। সভায় জানানো হয়, এ বছর এখন পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বমোট ৭৯ হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী সৌদি আরব পৌঁছেছেন। ২০১টি ফ্লাইটের মাধ্যমে আল্লাহর মেহমানদের এই আগমনী যাত্রা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

তবে হজের এই পুণ্যময় সফরের মাঝেই এখন পর্যন্ত ২৭ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী ইন্তেকাল করেছেন। যার মধ্যে পুরুষ ১৮ জন এবং নারী ৯ জন। সর্বশেষ গত ২২ মে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার বাসিন্দা ৬১ বছর বয়সী মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মক্কায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্তেকাল করা হজযাত্রীদের মধ্যে ১৮ জন মক্কায় এবং ৯ জন মদিনায় ইন্তেকাল করেছেন।

হজ মিশনের অফিশিয়াল পরিসংখ্যান বলছে, বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার চিকিৎসাসেবা এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় হাজিদের মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

২০২৫ সালে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৮ জন। ২০২৪ সালে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের মধ্যে মৃত্যু বরণ করেন ৬৫ জন। ২০২৩ সালে যেখানে রেকর্ড ১ লাখ২২ হাজারের বেশি হাজির মধ্যে ১২১ জন ইন্তেকাল করেছিলেন, সেখানে এবার কোটা কম হওয়া সত্ত্বেও সেবার মান বাড়ায় মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম।

তারও আগে ২০১৯ সালে যেখানে মৃত্যু হয়েছিল ১১৭ জনের। হজ মিশনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থেকে এবার এ পর্যন্ত ৪৭ হাজার ৪৭টি চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে এবং আইটি হেল্পডেস্কের মাধ্যমে প্রায় ২১ হাজার ৪৩৪টি ডিজিটাল সেবা নিশ্চিত করা হয়েছে, যা হাজিদের দ্রুত সুস্থতায় বড় ভূমিকা রাখছে।
সানা/আপ্র/২৫/৫/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

সৌদিতে এখন পর্যন্ত ২৭ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু
২৫ মে ২০২৬

সৌদিতে এখন পর্যন্ত ২৭ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু

এবছর হজ করতে গিয়ে এখন পর্যন্ত ২৭ বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৮ জন পুরুষ ও ৯ জন না...

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ
২৫ মে ২০২৬

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে আজ

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হচ্ছে সোমবার (২৫ মে) সকাল থেকে। হাজিরা মিনায় অবস্থানের মাধ্যমে...

যুদ্ধ সত্ত্বেও বিদেশি হজযাত্রী পনেরো লাখ ছাড়ালো
২৩ মে ২০২৬

যুদ্ধ সত্ত্বেও বিদেশি হজযাত্রী পনেরো লাখ ছাড়ালো

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধাবস্থা ও আঞ্চলিক অস্থিরতা চলমান থাকা সত্ত্বেও এবারের হজ পালনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ...

সৌদিতে পৌঁছেছেন ৭৭ হাজারের বেশি হজযাত্রী
২৩ মে ২০২৬

সৌদিতে পৌঁছেছেন ৭৭ হাজারের বেশি হজযাত্রী

চলতি বছর পবিত্র হজ পালনে এখন পর্যন্ত ১৯৯টি ফ্লাইটে মোট ৭৭ হাজার ৪৩২ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই