মহসীন হাবিব====
কয়েকদিন ধরে মজার একটি বিষয় দেখা যাচ্ছে। রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়কে দাঁড়ানো ট্রাফিক পুলিশ সিগন্যাল না দিলেও গাড়ির চালক ও বাইকাররা একা একাই থেমে যাচ্ছেন সিগন্যাল বাতির দিকে তাকিয়ে। যে চালকদের সামনে গিয়ে দু-দুই দিকে প্রসারিত করে তারপরও ট্রাফিক পুলিশ থামাতে পারতেন না, সেই চালকরাই এখন রাতারাতি ভদ্র হয়ে গেছেন। রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক সিগন্যালের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, এরা সবাই সিঙ্গাপুরের কঠোর আইনের মধ্যে দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। ঘটনা কী?
মূল ঘটনা হলো, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে ট্রাফিক পুলিশ ঘোষণা করল, দেশের বিভিন্ন ট্রাফিক সিগন্যালে আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দেবে এআই, অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্যামেরার মাধ্যমে। সেই মোতাবেক কার্যক্রম চালু হলো এবং মামলা দেওয়া শুরু হলো। ফলে জনগণ বুঝে গেল, সেখানে থাকবে না কোনো মামার ফোন, চলবে না কোনো ট্রাফিক পুলিশের পকেটে কিছু গুঁজে দেওয়া। এমনকি মামা নিজেও আইন অমান্য করলে মামলার ঝামেলায় পড়বেন। সঙ্গে সঙ্গে বাঙালি সোজা হয়ে গেল, অন্তত ঢাকার কয়েকটি মোড়ে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে প্রথম ঢাকার গুলশান-২-এ এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ক্যামেরা বসানো হয়েছিল পাইলট প্রকল্প হিসেবে। কিন্তু একটি মাত্র সিগন্যালে হওয়ায় তা নিয়ে কারও বিশেষ মাথাব্যথা ছিল না। দ্বিতীয়ত, গুলশান-২-এর ওই মোড়টিতে সাধারণত সিগন্যাল নিয়ে ঝামেলা হয় না। শত হলেও বড়লোকদের এলাকা তো! বড়লোকরা বড় অপরাধ পছন্দ করে, ছোট অপরাধে তাদের রোচে না। অবশ্য আরো একটি এলাকায় বহুকাল ধরে মানুষ ট্রাফিক আইন মেনে চলে, সেটা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা। ডান্ডা দেখলে ঠান্ডা।
শুনতে ভালো না লাগলেও দেশে একটি নীরব বিতর্ক বহুকাল ধরে আছে-দেশের মানুষ খারাপ, নাকি যারা শাসন করেন তারা খারাপ। অনেকটা ‘ডিম আগে না মুরগি আগে’ ধরনের বিতর্কের মতো। কিন্তু এখন অনেকটাই এই বিশ্বাসে উপনীত হওয়া গেছে যে, দেশের মানুষের আইন মেনে চলার বাধ্যবাধকতা নির্ভর করে সরকারের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। পৃথিবীর আইন মেনে চলা দেশগুলোতেও যে একেবারে আইন অমান্যকারী নেই বা অপরাধ নেই, তা নয়। তবে সেটা খুবই কম। ধরা পড়লে প্রেসিডেন্টেরও মাফ নেই, তাই মজ্জাগত অপরাধী ছাড়া কেউ আইন অমান্য করে না।
বাংলাদেশের মানুষ যে কোনো সভ্য দেশের মানুষের চেয়ে বেশি আইন মেনে চলত, যদি জানত ধরা পড়লে মাফ নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার বাংলাদেশি বসবাস করেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতার অনুপাত খুবই কম। দু-চারজনকে চরম মৌলবাদী সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। এর বাইরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অপরাধ প্রায় শূন্যের কোঠায়। তাহলে দেশে হয় না কেন? তার কারণ ওই একটাই-সবাই জানে এখানে আইন চলে না। বাহুশক্তি চলে, মামা-ভাগনে চলে, আর চলে টাকার খেলা। তাই আইন থেকে যায় উপেক্ষিত। মানুষের মধ্যে তৈরি হয় আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা।
তবে হ্যাঁ, অনেক ক্ষেত্রেই আইনের বাস্তবায়নে জটিলতা আছে। যেমন বাস, ট্রাক, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে আইন মানানো সহজ, কিন্তু যখন তিন চাকার রিকশা ও অটোরিকশা রাস্তায় চলে, তখন তাদের অনেক ক্ষেত্রে অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতেই মোকাবিলা করতে হয়।
যা হোক, মূল কথা হলো, যদি সর্বক্ষেত্রে এমন ধারণা সৃষ্টি করা যেত যে ‘ধরা পড়লে ছাড় নেই’, তাহলে দেশ সত্যিই সংস্কার হতো। তরতর করে সভ্যতার দিকে এগোনো যেত। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
প্রায়ই একটি কথা স্মরণ করি এবং উদাহরণ দিই। দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান বলেছিলেন, এ দেশে প্রতিটি মানুষ তার ক্ষমতাকে টাকায় রূপান্তর করে। ক্ষমতা বলতে তিনি বুঝিয়েছিলেন মূলত রাষ্ট্রপ্রদত্ত সাংবিধানিক ক্ষমতা। সচিব থেকে পিয়ন, প্রশাসন, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য-এমন কোনো স্থান সারা দেশে নেই, যার চেয়ারে বসা লোকেরা প্রদত্ত ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্থ আদায় করছেন না। এমনকি নালিশের সর্বশেষ কোনো জায়গাও অবশিষ্ট নেই।
মাত্র ২৫, ৩০ কিংবা ৪০ হাজার টাকা বেতনের চাকরিজীবী খুব কমই আছেন, যার অন্তত কোটি টাকার সম্পদ নেই। অন্যায় উপার্জন এ দেশে সাংস্কৃতিকভাবে বৈধতা অর্জন করেছে। এই অবস্থার পরিবর্তন একমাত্র শাসনক্ষমতায় থাকা রাজনীতিবিদরাই করতে পারেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তারা মুখরোচক কিছু কথা বলেন বটে, কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারাই সব অন্যায় উপার্জনকারীর বর্ম হিসেবে কাজ করেন, সুরক্ষা দেন।
এমন পরিস্থিতিতেই আসলে একটি দেশে বিপ্লবের প্রয়োজন হয়। ফরাসি বিপ্লব ও বলশেভিক বিপ্লব তার বড় উদাহরণ। কিন্তু বাংলাদেশে ২০২৪ সালে যা হয়েছে, তা এক রাক্ষস তাড়িয়ে আরেক রাক্ষসের জায়গা দখল ছাড়া কিছুই নয়। আমরা দেখেছি, আওয়ামী সরকারের বিরুদ্ধে যে ‘অভ্যুত্থান’ হয়েছে, সেটাকেও প্রথমে ক্ষমতায় এবং পরে টাকায় রূপান্তর করতে।
বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, ‘বেড়াই খেয়েছে ক্ষেত’। অর্থাৎ গরু-ছাগলের মুখ থেকে রক্ষার জন্য যে বেড়া দেওয়া হয়, সেই বেড়াই নিজে ক্ষেতের শস্য খেয়ে ফেলে। বাংলাদেশের অবস্থাও হয়েছে তাই। এবং এর একমাত্র কারণ দীর্ঘকাল ধরে আইনের শাসন না থাকা, আইনকে উপেক্ষা করা এবং ব্যক্তি বিশেষের জন্য আইনের ছাড় দেওয়া।
এর ব্যত্যয় না ঘটলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এক ফোঁটাও সামনে এগোবে না; বরং পেছনের দিকেই হাঁটতে থাকবে, যার লক্ষণ বর্তমানে প্রকট হয়ে উঠেছে।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।
সানা/আপ্র/১৭/৬/২০২৬