নতুন বাংলা বছর ১৪৩৩ বর্ষবরণে রাজধানীসহ সারা দেশে উৎসবের আবহ বিরাজ করেছে। রাজধানীর রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে গান ও কবিতার সুরে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। মঙ্গলবার (১৫ এপ্রিল) ভোর সাড়ে ছয়টায় শুরু হওয়া এই আয়োজনে শতাধিক শিল্পীর সম্মিলিত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক লগনে’ গান পরিবেশিত হয়। মিরাজুল জান্নাত সোনিয়া, ঐশ্বর্য সমাদ্দার, প্রিয়ন্ত দেব ও সমুদ্র শুভমের কণ্ঠে পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এবারের আয়োজনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’। সকাল আটটা পঁচিশ মিনিটে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হওয়া বহুল প্রতীক্ষিত বৈশাখী শোভাযাত্রায় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে পুরো ক্যাম্পাস উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বর্ণিল মোটিফ, ঢাক-ঢোল ও লোকজ সংস্কৃতির উপস্থাপনায় শোভাযাত্রা শেষ হয় চারুকলা প্রাঙ্গণে। শোভাযাত্রায় পরিবেশ, কৃষি, শিক্ষা ও আন্তর্জাতিক নানা ইস্যু প্রতিফলিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে থাকা ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’সহ বিভিন্ন প্রতীকী প্ল্যাকার্ড দৃষ্টি আকর্ষণ করে। শোভাযাত্রা ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং পরিচয়পত্র ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল।
এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনেও ছিল নববর্ষের আমেজ। শিশু, কিশোর, তরুণ থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে রঙিন হয়ে ওঠে পুরো ঢাকা।
দেশের বিভিন্ন জেলায়ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়। চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, ময়মনসিংহসহ প্রতিটি বিভাগীয় ও জেলা শহরে বের হয় শোভাযাত্রা, অনুষ্ঠিত হয় লোকজ মেলা, গান, নৃত্য ও আবৃত্তি। পাহাড়ি অঞ্চলেও বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে বর্ষবরণ উৎসব রূপ নেয় সম্প্রীতির মিলনমেলায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দিনভর সাংস্কৃতিক আয়োজন, গ্রামীণ খেলাধুলা ও মেলার মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করা হয়। বরিশাল ও খুলনায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ও লোকজ ঐতিহ্যের উপস্থাপনা উৎসবকে করে তোলে আরো বর্ণিল।
সারা দেশে নববর্ষের এই আয়োজন পরিণত হয় আনন্দ, সম্প্রীতি ও সংস্কৃতির এক অভিন্ন উৎসবে, যেখানে পুরনোকে বিদায় জানিয়ে নতুন সম্ভাবনার প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠে জনপদ।
শান্ত-মারিয়ামে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ বরণ: বৈশাখী শোভাযাত্রা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনাসহ নানা আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দকে বরণ করে নিয়েছে শান্ত-মারিয়াম ও দেশের প্রথম ডিজাইন ও সংস্কৃতিনির্ভর সৃজনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি।
মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য বৈশাখী শোভাযাত্রা। বড় মাছ, ময়ূর, পুতুল, প্যাঁচা, ঈগল ও বাঘসহ নানা বৈশাখী প্রতীক এবং রঙিন মুখোশে সাজানো শোভাযাত্রাটি ক্যাম্পাস সংলগ্ন বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে শান্ত-মারিয়াম একাডেমি ঘুরে পুনরায় ক্যাম্পাসে ফিরে আসে।
শোভাযাত্রা শেষে ঐতিহ্যবাহী খই, মুড়ি, বাতাসা, মৌসুমি ফল ও শরবতের আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে পর্বটির সমাপ্তি ঘটে।
এ আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান বরেণ্য চিত্রশিল্পী অধ্যাপক মোস্তাফিজুল হক, শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশন ও সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিসের চেয়ারম্যান এবং বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ডা. আহসানুল কবির, উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. শাহ-ই-আলম, বরেণ্য চিত্রশিল্পী অধ্যাপক হাশেম খান, ডেজিগনেটেড ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ আব্দুল হালীম শেখ, ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক শিশির কুমার ভট্টাচার্য্য, ফাইন অ্যান্ড পারফর্মিং আর্টস অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. প্রদীপ কুমার নন্দী, রেজিস্ট্রার ড. পাড় মশিয়ূর রহমান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাশিউদ্দিন আনোয়ার আহমেদ, জিডিএম বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালক মো. মনিরুল ইসলামসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে বাংলা নববর্ষ ও হালখাতাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অতিথিরা বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
সবশেষে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে। বর্ষবরণ উপলক্ষে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও উচ্ছ্বাসে ক্যাম্পাসজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আজকের প্রত্যাশার শ্রীপুর প্রতিনিধি আব্দুস সালাম রানা জানান, গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার শৈলাট নতুন বাজারে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে ঐতিহ্যবাহী কাছি টান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে দিনব্যাপী এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রতিযোগিতায় শৈলাট একাদশ, বাঁশবাড়ি একাদশ, ধনুয়া একাদশ, ভাই ভাই একাদশ, বদনীভাঙ্গা একাদশ, গোতার বাজার একাদশ, শৈলাট দক্ষিণপাড়া ও চকপাড়া একাদশসহ মোট আটটি দল অংশ নেয়।
খেলা উপভোগ করতে আশপাশের এলাকা থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষের ঢল নামে। দর্শকদের স্লোগান ও করতালিতে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এস এম মো. মাহফুল হাসান হান্নান। তিনি বলেন, গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে এমন আয়োজন নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। সভাপতিত্ব করেন গাজীপুর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. এনামুল হক মনি এবং খেলা পরিচালনা করেন জাহাঙ্গীর আলম মাস্টার। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। আধুনিকতার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া এ লোকজ খেলাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগকে স্থানীয়রা স্বাগত জানিয়েছেন।
মেহেরপুর প্রতিনিধি এস এ খান শিল্টু জানান, মেহেরপুরে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পহেলা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপিত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসক চত্বরে পাকুরতলায়, যেখানে ভোর ৮টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দিনের কর্মসূচির সূচনা করা হয়। এরপর লোকসংগীত, কবিগান ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের সুরে পুরো পরিবেশ উৎসবমুখর হয়ে ওঠে।
চিরচেনা রবীন্দ্রসংগীত ‘এসো হে বৈশাখ’ পরিবেশনের মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করা হয়। গান শেষে শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী রায়ের নেতৃত্বে শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শহীদ শামসুদ্দোজা নগর উদ্যানে গিয়ে শেষ হয়।
শোভাযাত্রার অগ্রভাগে মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা লাল-সবুজ পোশাকে ‘শুভ নববর্ষ’ লেখা ব্যানার বহন করে অংশ নেয়, যা উৎসবের আবহকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। শোভাযাত্রায় প্রশাসন, পুলিশ ও বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতারাও অংশগ্রহণ করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায়, জেলা পরিষদের প্রশাসক জাভেদ মাসুদ মিলটন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম শাখাপি ইবনে সাজ্জাদ, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তরিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) পার্থপ্রতিম শীল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ খায়রুল ইসলামসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।
মেহেরপুর সরকারি কলেজ, জিনিয়াস ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মেহেরপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী শোভাযাত্রায় অংশ নেয়।
শোভাযাত্রাজুড়ে ভেসে ওঠে ‘এসো হে বৈশাখ’, ‘আজও আছে একতারা আর নকশিকাঁথার মাঠ’সহ নানা দেশীয় গান। নববর্ষের এ আয়োজনে নববধূ, বোষ্টম-বোষ্টমী, সাপুড়ে, জেলে, তাঁতী, কামার-কুমারের বেশে অংশগ্রহণকারীরা লোকজ ঐতিহ্যের অনন্য রূপ তুলে ধরেন।
দিনব্যাপী এ আয়োজন মেহেরপুরে সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক প্রাণবন্ত উৎসবে পরিণত হয়।
বদরগঞ্জ প্রতিনিধি মাহবুব রহমান বিপ্লব জানান, রংপুরের বদরগঞ্জে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আঞ্জুমান সুলতানার নেতৃত্বে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়।
শোভাযাত্রা শেষে উপজেলা চত্বরে আলোচনা সভা, পুরস্কার বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আঞ্জুমান সুলতানা সভাপতিত্ব করেন।
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক পরিতোষ চক্রবর্তী এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর কামরুজ্জামানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ। দিনব্যাপী এসব আয়োজনে স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সানা/আপ্র/১৫/৪/২০২৬