আরশাদ খানের লেংথ ডেলিভারি লং-অনের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিলেন ভিরাট কোহলি। বলের পরিণতি বুঝতে পেরে তিনি আগেই হেলমেট খুলে ফেললেন। গ্যালারির দিকে ইশারা করে হাত নাড়লেন। ততক্ষণে ডাগআউট থেকে মাঠে ছুটে এসেছেন তার অন্য সতীর্থরা। চলতে থাকল তাদের আনন্দ-উল্লাস। দাপুটে জয়ে আবার আইপিএল চ্যাম্পিয়ন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
আহমেদাবাদে রোববার (৩১ মে) ফাইনালে গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে রাজাত পাতিদারের দলের জয় পাঁচ উইকেটে।
জয়ের ভিত গড়ে দেন বেঙ্গালুরুর বোলাররা। তাদের দারুণ বোলিংয়ে ১৫৫ রানে আটকে যায় গুজরাট।
আসরজুড়ে চমৎকার বোলিং করা বেঙ্গালুরুর পেস ত্রয়ী- ভুবনেশ্বর কুমার, জশ হেইজেলউড ও রাসিখ সালাম জ্বলে ওঠেন আবার। ২৭ রানে ৩ উইকেট নিয়ে ফাইনালের সফলতম বোলার রাসিক। ভুবনেশ্বর ২৯ রানে ও হেইজেলউড ৩৭ রানে নেন ২টি করে উইকেট।
মাঝের ওভারগুলোয় আঁটসাঁট বোলিংয়ে স্রেফ ২৩ রানে একটি উইকেট নেন স্পিনার ক্রুনাল পান্ডিয়া।
রান তাড়ায় ভেঙ্কাটেশ আইয়ারের ব্যাটে উড়ন্ত শুরু পাওয়া দলকে জয়ের ঠিকানায় নিয়ে যান আরেক ওপেনার কোহলি। আইপিএলে নিজের দ্রুততম ফিফটিতে ৯ চার ও তিন ছক্কায় ৪২ বলে ৭৫ রানের ইনিংসে জয় নিয়ে ফেরেন ভারতের ব্যাটিং গ্রেট। দুই ওভার হাতে রেখেই জিতে যায় বেঙ্গালুরু।
আইপিএলের প্রথম ১৭ আসরে শিরোপাশূন্য বেঙ্গালুরু ও কোহলির অপেক্ষার অবসান হয় গত মৌসুমে। পরের মৌসুমে ধরাই দিল তাদের আরেকটি ট্রফি।
গত আসরের আগে পাতিদারকে অধিনায়কত্ব দিয়েছিল বেঙ্গালুর। তার হাত ধরেই এলো দুটি ট্রফি।
শর্ট বলের পরিকল্পনায় সফল হয় বেঙ্গালুরুর পেসাররা। গুজরাট অধিনায়ক শুবমান গিল, সাই সুদার্শান, নিশান্ত সিন্ধু, রাহুল তেওয়াতিয়া, জেসন হোল্ডার ও রাশিদ খান- প্রত্যেকেই আউট হন শর্ট ডেলিভারিতে।
দলটির প্রথম চার ব্যাটসম্যানের কেউই ২০ ছাড়াতে পারেননি। পাঁচ নম্বরে নেমে সর্বোচ্চ ৫০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন ওয়াশিংটন সুন্দার।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামে গুজরাট। প্রথম দুই ওভারে দুটি চার মারেন সুদার্শান। তৃতীয় ওভারে হেইজেলউডের প্রথম বলে চার মেরে পরের বলে বিদায় নেন গিল। পরের ওভারে সুদার্শানকে ফেরান ভুবনেশ্বর।
জস বাটলারের আগে তিন নম্বরে নামানো হয়েছিল তরুণ ব্যাটসম্যান নিশান্তকে। শুরুটা ভালো করলেও টিকতে পারেননি তিনি (১৮ বলে ২০)। ধুঁকতে থাকা বাটলার ১৯ রান করতে খেলেন ২৩ বল।
পাওয়ার প্লের শেষ বল থেকে ত্রয়োদশ ওভারে আরশাদের ছক্কার আগে পর্যন্ত টানা ৪০ বলে কোনো বাউন্ডারিই পায়নি গুজরাট! আইপিএল ফাইনালে বাউন্ডারি ছাড়া দীর্ঘতম বিরতি এটিই।
আরশাদ, তেওয়াতিয়া, হোল্ডাররা শেষের দাবি মেটাতে পারেননি। এক প্রান্তে দলকে একাই টানেন ওয়াশিংটন। শেষ ওভারে ফিফটি পূর্ণ করেন তিনি ৩৭ বলে।
১৫৫ রানের পুঁজি নিয়ে জিততে হলে বোলিংয়ে অসাধারণ কিছু করে দেখাতে হতো গুজরাটকে। তবে শুরুতেই তাদের এলোমেলো করে দেন ভেঙ্কাটেশ। দ্বিতীয় ওভারে কাগিসো রাবাদাকে তিনটি চার ও একটি ছক্কা মারেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
পরের ওভারে মোহাম্মাদ সিরাজের বলে দুটি চার আসে কোহলির ব্যাটে, একটি চার মারেন ভেঙ্কাটেশও। রাবাদার পরের ওভারের প্রথম চার বলে তিনটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকান কোহলি।
প্রথম চার ওভারেই পঞ্চাশ পেরিয়ে যায় বেঙ্গালুরু। পঞ্চম ওভারে সিরাজকে ছক্কার পরের বলে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ভেঙ্কাটেশ। চারটি চার ও দুটি ছক্কায় ১৬ বলে ৩২ রান করেন তিনি।
দেবদুত পাডিক্কাল বিদায় নেন দ্রুতই। ওই ওভারেই রাবাদাকে দারুণ শটে ছক্কা মারেন কোহলি।
একটি করে চার ও ছক্কা মেরে রাশিদ খানের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন পাতিদার। ওই ওভারে পান্ডিয়াকেও এলবিডব্লিউ করে লড়াই জমিয়ে তোলার আভাস দেন রাশিদ।
তবে কোহলি দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে এগিয়ে নেন দলকে। ফিফটি করেন তিনি ২৫ বলে। ২০১৮ আসরে রাজস্থান রয়্যালসের বিপক্ষে ২৬ বলে ফিফটি ছিল তার আগের দ্রুততম।
পঞ্চম উইকেটে কোহলির সঙ্গে ৪১ রানের জুটির পথে ১৭ বলে ২৪ রান করেন টিম ডেভিড। জিতেশ শার্মাকে নিয়ে বাকি পথটুকু পাড়ি দেন কোহলি।
জয় থেকে ১১ রান দূরে থাকতে গিল মিড-অফে কোহলির ক্যাচ নিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছিল। ব্যাটসম্যানকে প্যাভিলিয়নের দিকে হাঁটার জন্য ইশারা করেন আম্পায়ার নিতিন মেনন। কিছুটা হেঁটে গিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়ান কোহলি। টিভি আম্পায়ার কয়েকবার রিপ্লে দেখে ‘নট আউট’ ঘোষণা করেন বল মাটি ছুঁয়েছিল বলে।
তখনই যা একটু উত্তেজনা ছড়ায়। অষ্টাদশ ওভারের শেষ দুই বলে চার ও ছক্কা মেরে সবকিছুর ইতি টেনে দেন কোহলি।
চমৎকার ইনিংসে কোহলিই হন ফাইনালের সেরা। ৩৭ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান আসর শেষ করলেন ১৬ ইনিংসে চতুর্থ সর্বোচ্চ ৬৭৫ রান করে। রেকর্ডের বন্যা বইয়ে ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে ১৬ ইনিংসে সর্বোচ্চ ৭৭৬ রান করে টুর্নামেন্ট সেরা ১৫ বছর বয়সী বৈভাব সুরিয়াভানশি।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
গুজরাট টাইটান্স: ২০ ওভারে ১৫৫/৮ (সুদার্শান ১২, গিল ১০, নিশান্ত ২০, বাটলার ১৯, ওয়াশিংটন ৫০*, আরশাদ ১৫, তেওয়াতিয়া ৭, হোল্ডার ৭, রাশিদ ৭, রাবাদা ৩*; ডাফি ৪-০-৩৮-০, ভুবনেশ্বর ৪-০-২৯-২, হেইজেলউড ৪-০-৩৭-২, রাসিখ ৪-০-২৭-৩, পান্ডিয়া ৪-০-২৩-১)
রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু: ১৮ ওভারে ১৬১/৫ (ভেঙ্কাটেশ ৩২, কোহলি ৭৫*, পাডিক্কাল ১, পাতিদার ১৫, পান্ডিয়া ১, ডেভিড ২৪, জিতেশ ১১*; সিরাজ ৪-০-৩৬-১, রাবাদা ৩-০-৪৪-১, হোল্ডার ২-০-১৬-০, রাশিদ ৪-০-২৫-২, আরশাদ ৪-০-৩২-১, প্রাসিধ ১-০-৭-০)
ফল: বেঙ্গালুরু ৫ উইকেটে জিতে চ্যাম্পিয়ন
ম্যান অব দা ম্যাচ: ভিরাট কোহলি
ম্যান অব দা টুর্নামেন্ট: বৈভাব সুরিয়াভানশি
সানা/আপ্র/১/৬/২০২৬