যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শান্তি আলোচনায় দুই পক্ষের অংশগ্রহণকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বাংলাদেশ সরকার। যদিও এখনো দৃশ্যমান কোনো সমাধান আসেনি, তবুও একই টেবিলে বসাকে কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবেই বিবেচনা করছে ঢাকা।
রোববার (১২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম এ অবস্থান তুলে ধরেন।
সমাধান না এলে বাড়বে বৈশ্বিক সংকট: প্রতিমন্ত্রী বলেন, আলোচনার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বেরিয়ে আসা জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি আরো অবনতির দিকে যেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বে। তার ভাষায়, আলোচনায় অগ্রগতি না হলে “প্রত্যেকটা দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে”-অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সামগ্রিকভাবে। এই সম্ভাব্য বৈশ্বিক ক্ষতির আশঙ্কাই বাংলাদেশকে কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।
যুদ্ধ নয়, কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে শামা ওবায়েদ বলেন, যে কোনো মূল্যে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে কূটনৈতিক সমাধানই হতে পারে একমাত্র টেকসই পথ।
তিনি উল্লেখ করেন, যুদ্ধের ময়দানে দুই পক্ষ লড়াই করলেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে, প্রাণহানি ঘটছে নিরপরাধ মানুষের।
মধ্যস্থতা উদ্যোগে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনায় তৃতীয় পক্ষের মধ্যস্থতাকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, অন্তত আলোচনায় বসতে রাজি হওয়াটাই প্রমাণ করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সংঘাত নিরসনে আগ্রহী।
তবে আলোচনার প্রথম ধাপ থেকে ফলাফল না আসা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি। তার মতে, আলোচনা চলমান থাকায় এ মুহূর্তে মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
মধ্যপ্রাচ্যে নিহত আট বাংলাদেশি: মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত আটজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বশেষ লেবাননে একজন নারী কর্মীর মৃত্যু হয়েছে, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
তিনি বলেন, এই যুদ্ধে বাংলাদেশের নাগরিকদের প্রাণহানি দেশের জন্য গভীর শোকের বিষয় এবং এটি যুদ্ধ বন্ধের প্রয়োজনীয়তাকে আরো জোরালোভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
মরদেহ ফেরাতে জটিলতা: নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের মরদেহ ইতোমধ্যে দেশে আনা হয়েছে। একজনকে বিদেশেই দাফন করা হয়েছে পরিস্থিতির কারণে। আরেকজনের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
লেবাননে নিহত নারীর মরদেহ ফেরত আনতে সময় লাগবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। যুদ্ধাবস্থার কারণে স্বাভাবিক বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় এই প্রক্রিয়া জটিল হয়ে উঠেছে।
ঝুঁকিতে বাংলাদেশ মিশন ও প্রবাসীরা: লেবাননের পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করে শামা ওবায়েদ বলেন, সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তারাও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সেখানে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা আপাতত নিরাপদ আছেন বলে জানানো হয়েছে।
জ্বালানি ও অর্থনীতি নিয়ে সতর্ক সরকার: এই সংঘাতের প্রভাব যাতে দেশের জ্বালানি সরবরাহ ও দ্রব্যমূল্যে না পড়ে, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকে এবং জনগণ অতিরিক্ত চাপের মুখে না পড়ে।
শান্তির প্রত্যাশায় কূটনৈতিক নজর: সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কূটনৈতিক সংলাপকেই একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে। আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান আসবে-এমন প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছে ঢাকা।
বিশ্ব পরিস্থিতির এই সংকটময় সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার-এমন বার্তাই তুলে ধরেছে বাংলাদেশ সরকার।
সানা/আপ্র/১২/৪/২০২৬