শহরের ভিড়ভাট্টা অলিগলি, ধুলোমাখা পথ আর রাতের নিঃশব্দ আকাশের নিচে এক নারী ঘুরে বেড়ান কাঁধে একটি থলে নিয়ে। গায়ে জীর্ণ পোশাক, চুলে বাতাসের এলোমেলোতা—তবু তাঁর কণ্ঠে আছে এক অদ্ভুত মায়া, এক অচেনা আলো। সেই কণ্ঠই এখন ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, পৌঁছে গেছে ঘর থেকে ঘরে।
হ্যাঁ, ফরিদপুর শহরের অলিগলি কখনো কখনো কেবল রাস্তা থাকে না—তা হয়ে ওঠে একেকটি জীবনের চলমান গল্প। সেই গল্পেরই এক চলন্ত অধ্যায় লাইলী বেগম। জীর্ণ কাপড়ের শীর্ণ মানুষটির চোখে ক্লান্তির ছায়া—তবু বুকের গভীরে অদ্ভুত এক অদম্য সুরের আগুন। শহরের মানুষ তাঁকে চেনে “লাইলী খালা”, কেউ ডাকে “লাইলী পাগলি”, কেউ আবার খুব নরম গলায় বলে—“মাটির শিল্পী”।
৬৫ বছরের এই নারী কোনো মঞ্চে বাঁধা নন। তাঁর মঞ্চ হলো পথ, তাঁর তাল শহরের শব্দ, তাঁর সুর মানুষের ভিড় আর থেমে যাওয়া দৃষ্টির ভেতর লুকানো নীরবতা। যেখানে গান, সেখানেই তিনি—মেলা, মাজার, বাউল আখড়া কিংবা কোনো আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক আসর। দাওয়াত লাগে না, অনুমতিও না—সুর ডাকলেই তিনি হাজির।
গত ২৪ মে ফরিদপুরে নজরুল জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে কাজী নজরুল ইসলামের “নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল” গেয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েন। মুহূর্তের ভেতরেই সেই কণ্ঠ হয়ে ওঠে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। জীর্ণ পোশাকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা সেই দরদভরা সুর মানুষকে থমকে দেয়—কারও চোখে বিস্ময়, কারও চোখে মুগ্ধতা, কারও চোখে অচেনা এক করুণা।
কিন্তু এই ভাইরাল হওয়া কোনো নতুন জন্ম নয়। এটি শুধু দীর্ঘ জীবনের এক ক্ষণিক আলো।
লাইলী বেগমের জীবনের শুরুও ছিল সুরের ভেতরেই। শৈশবে মা-বাবাকে হারান তিনি—কারা ছিলেন, কোথা থেকে এসেছিলেন, আজও তার স্পষ্ট উত্তর নেই। ফরিদপুরের গোয়ালচামট এলাকার এক নারী তাঁকে বড় করে তোলেন। সেখানেই প্রথম হারমোনিয়ামের সঙ্গে পরিচয়, প্রথম গান শেখা, প্রথম সুরের ভেতর নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া।
এই সুরই পরে হয়ে ওঠে তাঁর আশ্রয়, তাঁর বিদ্রোহ, তাঁর পালানো।
অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাঁর। সংসারের ভেতরেও গান ছিল, কিন্তু ছিল বাধাও। বলা হয়, জীবনের এক পর্যায়ে অভিমান জমতে জমতে তিনি বেরিয়ে আসেন ঘর থেকে। স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে সেই অভিমানের দেয়ালে শেষ ইট বসায়। এরপর থেকে স্থায়ী ঠিকানা শব্দটা তাঁর জীবনে শুধু কাগজেই রয়ে যায়। বাস্তবে তিনি হয়ে ওঠেন শহরের এক চলমান ছায়া—কখনো মাজারে রাত, কখনো পল্লী কবির বাড়ির উঠোন, কখনো কোনো অচেনা গানের আসর।
তবু তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য—তিনি গান ছাড়া থাকতে পারেন না।
তিনি বলেন, “গানই আমার জীবন। গান ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। গান মানুষের আত্মার খোরাক।”
এই কথার ভেতরে কোনো অভিনয় নেই, নেই কোনো সাজানো আবেগ—এটা যেন বহু বছরের বেঁচে থাকার একমাত্র ব্যাখ্যা।
ফরিদপুরের প্রবীণ সংস্কৃতিকর্মীরা বলেন, লাইলী বেগমকে তারা প্রায় দুই দশক ধরে দেখছেন। শহরের যেকোনো সাংস্কৃতিক আসরে তিনি হঠাৎই উপস্থিত হয়ে যান—চুপচাপ বসে থাকেন, আবার সুযোগ পেলেই উঠে দাঁড়িয়ে গান ধরেন। তাঁর কণ্ঠে কখনো লালন, কখনো নজরুল, কখনো কাওয়ালি—এক অদ্ভুত মিশ্র সুরের ভুবন।
কিন্তু এই ভুবনের বাইরেও আছে এক নিঃসঙ্গ বাস্তবতা।
হারুকান্দি এলাকায় তাঁর ছোট্ট দুটি জরাজীর্ণ ঘর আছে। সেখানে থাকেন তাঁর দুই ছেলে। বড় ছেলে রংমিস্ত্রি, ছোট ছেলে মাংস ব্যবসায়ী। মেয়ে-ছেলেরা সংসারী হলেও লাইলী বেগমের জীবনের ঠিকানা সেই ঘর নয়—তিনি সেখানে আসেন, আবার হারিয়ে যান।
প্রায় ১৩–১৫ বছর আগে তিনি স্বামীর সংসার ছেড়ে বেরিয়ে যান। তারপর থেকে স্থায়ীভাবে আর ফিরে যাননি। জীবনের নিয়ম, সমাজের শৃঙ্খলা, ঘরের সীমানা—সবকিছুকে ছাপিয়ে তাঁর নিজের এক আলাদা পথচলা শুরু হয়।
এই পথচলার ভেতরেই জন্ম নেয় তাঁর আরেক পরিচয়—“মানুষ দেখা”।
তিনি বলেন, “আমি মানুষ দেখি। দুনিয়াতে কত রকমের মানুষ, কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার ভাল্লাগে।”
এই বাক্য যেন তাঁর দর্শন—জীবনকে বিচার নয়, দেখা; মানুষকে এড়িয়ে নয়, বোঝা।
তাঁর সম্পর্কে স্থানীয়রা বলেন, তিনি কারও ক্ষতি করেন না। শহরের যে কোনো প্রান্তে তাঁকে দেখা যায়, আবার হঠাৎই অদৃশ্য হয়ে যান। কেউ তাঁকে দেখে করুণা করেন, কেউ বিরক্ত হন, আবার কেউ শ্রদ্ধা নিয়ে থেমে যান। একবার এক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে তাঁকে ৩০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল—তিনি ১০০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, “অতো লাগবে না, যাগো পেটে খিদে, তাগো বেশি দেন।”
এই একটি ঘটনা তাঁকে শুধু শিল্পী নয়, মানুষ হিসেবে আরো গভীর করে তোলে।
লাইলী বেগমের জীবনে অভাব আছে, ঠিকানা নেই, স্থিরতা নেই। কিন্তু আছে সুর—এক অদৃশ্য আশ্রয়, যা তাঁকে প্রতিদিন টিকিয়ে রাখে। কখনো অপমান, কখনো অবহেলা, কখনো মঞ্চের আলো—সবকিছুর মাঝেও তিনি একইভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন, গেয়ে ওঠেন, আবার হারিয়ে যান।
সমাজ হয়তো তাঁকে সংজ্ঞায়িত করতে চায়—ভবঘুরে, পাগল, শিল্পী। কিন্তু লাইলী বেগম নিজেকে কোনো নামেই বাঁধেন না। তাঁর কাছে জীবন মানে গান, আর গান মানে বেঁচে থাকা।
ফরিদপুরের সেই ধুলোমাখা পথগুলো তাই শুধু রাস্তা নয়—তা হয়ে ওঠে এক জীবন্ত সুরের মানচিত্র। যেখানে জীর্ণ এক নারীর কণ্ঠে ভেসে ওঠে অভিমান, অভাব আর অনন্ত ভালোবাসার মিশ্র এক মানবিক সুর।
সানা/আপ্র/২৮/৫/২০২৬