লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সাংবাদিক আকবর হোসেন। এরপর নানা মহলে প্রশ্ন তৈরি হয় পদত্যাগের কারণ নিয়ে। রোববার (১২ এপ্রিল) ভিডিও বার্তায় তিনি তা স্পষ্ট করেন।
আকবর হোসেন বলেন, ‘গত বেশ কয়েকদিন ধরে অনেক ফোন কল পাচ্ছি, অনেক টেক্সট এসএমএস এবং প্রশ্ন একটাই যে- আমি কেন লন্ডনে বাংলাদেশ হাই কমিশনের প্রেস মিনিস্টারের পদ থেকে রিজাইন করলাম! অনেকের কাছে আমি এটা ব্যক্তিগতভাবে এক্সপ্লেইন করেছি।
কিন্তু আসলে সবাইকে তো আর জনেজনে বলা সম্ভব না, অনেকেই ভাবছেন যে এটা আমি বেশ আকস্মিক একটা সিদ্ধান্ত নিলোাম, হুট করে এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিলোাম। ব্যাপারটা কিন্তু ওরকম না। আমি গত বেশ কয়েক মাস ধরেই ভাবছিলাম যে, আমি এখানে হয়তো আর কাজ করবো না। কেন করবো না- সেটা একটা বড় প্রশ্ন।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা হয়তো অনেকে জানেন যে, আমি প্রায় ২২ বছর সাংবাদিকতা করেছি। কিন্তু আমি যখন লন্ডনে পৌঁছালাম লন্ডনে পৌঁছে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি বুঝে গেলাম যে- এখানে প্রেস মিনিস্টারের যে কাজ, এটা আসলে আমি করতে পারবো না বা এই কাজটা আমার জন্য না। প্রশ্ন হচ্ছে কেন আমার জন্য না? আমার জন্য না এই কারণে- গত এক বছর ধরে আমি এখানে অনেক চেষ্টা করলাম, দেখলাম যে এখানে কোনো প্রোডাক্টিভ কাজ সেই অর্থে নেই।
এর মানে হচ্ছে ধরুন আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, আমরা সবসময় নিউজ চেজ করি, স্টোরি চেজ করি, সারাক্ষণ একটা ব্যস্ততার মধ্যে থাকি। আমরা যে কাজগুলো করি এটাকে মেজার করা যায় দিন শেষে যে, কি করলাম সেটার ইম্প্যাক্টটা কি হলো? কিন্তু প্রেস মিনিস্টারের যে কাজ- এই কাজের কোনো ইমপ্যাক্ট মেজার করার সেরকম কোনো কিছু আমি দেখিনি এবং আমি একটা পর্যায়ে এসে দেখলাম যে এখানে আমার দিনের পর দিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোন কাজ নেই।’
আকবর হোসেন বলেন, ‘আপনারা জানেন যে, সরকারি যে কাজ এটা তো একটা সিস্টেমের মধ্যে চলে। সেই সিস্টেম ভালো কি মন্দ সেটা অন্য হিসেব। কিন্তু সেটাকে ব্রেক করেও আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন না।
কিছু হয়তো করতে পারবেন, কিন্তু খুব বেশি কিছু করার সুযোগ এখানে নেই। এই কাজ না থাকতে থাকতে অলমোস্ট ডিপ্রেশনে চলে যাওয়ার মতো একটা দশা আমার। কারণ, যে আমি একসময় ১০-১২ ঘন্টা কাজ করতাম প্রতিদিন, হঠাৎ করে আমি এসে দেখলাম যে, প্রতিদিন আমি দুই ঘন্টাও কাজ করছি না।
কোনো কোনো দিন আমি এক ঘন্টাও কাজ করছি না। একটা সময় আমার মনে হচ্ছিল যে, আমার ব্রেইন মনে হয় ননফাংশনাল হয়ে যাচ্ছে। আমি ক্রিয়েটিভলি কোনো কিছু চিন্তা করতে পারছি না। তার চেয়ে আরেকটা বড় কারণ আমি নিজেই ব্যাখ্যা করেছি যে, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত কারণে আমার ঢাকায় থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এখন আমার কাছে যেটা মনে হয়, এই প্রেস মিনিস্টার ভুমিকার বাইরে থেকে দেখে এটা অনেক কিছু মনে হয়। এটা একটা গাল-ভরা পদবি, শুনতে অনেক ভালো লাগে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এখানে কাজটা কি? যারা অ্যাক্টিভ জার্নালিস্ট যারা সত্যিকার অর্থে সাংবাদিকতার মাঠে থাকে বা সাংবাদিকতা করে, ইম্প্যাক্টফুল জার্নালিজম করে, তাদের জন্য এই পোস্টে এখানে কাজ করাটা সুইটেবল না। এটা তাদের জন্য না। আমার যে এক্সপেরিয়েন্স, সেটা ফরেন মিনিস্ট্রিতে যারা কাজ করেন তাদের জন্য যদি একটা মিডিয়া ট্রেনিং কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা হয়, টাইম টু টাইম যদি তাদের ট্রেনিং মডিউলটাকে আপডেট করা হয়- এই কাজটা তারাই করতে পারেন।’
আকবর হোসেন আরো বলেন, ‘এখনকার দিনে আপনারা জানেন যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের যে উত্থান এবং অন্যান্য বিষয়গুলো- এটার জন্য আসলে আগের সিস্টেমে আর কাজ করলে চলবে না। সুতরাং গভর্নমেন্ট সিস্টেম তো এখন সেই পুরনো ভাব অনেকটা রয়ে গেছে- এটাকে অনেক বেশি রিফর্ম করতে হবে। সব মিলিয়ে আমার কাছে মনে হয়েছে যে, এই জায়গাটা আমার না।’
তিনি বলেন, ‘অনেকে এটার সঙ্গে অনেক রাজনৈতিক বিষয়ে জড়াতে চাচ্ছেন যে আমাকে সরকার থেকে বলা হয়েছে কিনা রিজাইন করার জন্য। না আমাকে কোন কিছুই বলা হয়নি এবং আমি যে এখানে কন্টিনিউ করতে চাই না বা থাকবো না এই বিষয়টা আমি মৌখিকভাবে জানিয়েছিলাম- যাদেরকে জানানোর দরকার।
আমার কাছে মনে হয় যে সাংবাদিকতায় ফিরে আসাটাই হচ্ছে আমার আসল জায়গা- ওটাই আমার জায়গা। আমি যা করি না কেন, ভালো করি। লোকে প্রশংসা করুক নিন্দা করুক সাংবাদিকতা থেকে কাজ করে সে প্রশংসা এবং নিন্দা নেওয়াটাই হচ্ছে আমার কাজ এবং সেখানেই আমি কমফোর্টেবল।’
সানা/ডিসি/আপ্র/১২/৪/২০২৬