অগ্নিঝরা মার্চ কেবল আবেগের নয়, গভীর আত্মসমালোচনারও সময়। ২৫ মার্চের সেই বিভীষিকাময় রাত, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা-এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই জন্ম নেয় এক নতুন রাষ্ট্র-বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান-এর নেতৃত্বে স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান-এর ঘোষণাপাঠ আন্তর্জাতিক পরিসরে সেই বার্তাকে ছড়িয়ে দেয়।
এই ইতিহাসের প্রতিটি স্তরে রয়েছে রক্ত, ত্যাগ, এবং একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৬তম বছরে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে-আমরা কি সেই ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম দায়বদ্ধতা দেখাতে পেরেছি?
জাতীয় বয়ানের সংকট: রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস আমাদের একটি মৌলিক শিক্ষা দেয়-একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার অতীত সম্পর্কে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাধীনতার ইতিহাসই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় বিভাজনের ক্ষেত্র।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি-এই দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তির দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব স্বাধীনতার ইতিহাসকে প্রমাণভিত্তিক গবেষণার বিষয় থেকে সরিয়ে এনে রাজনৈতিক ব্যাখ্যার প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে। ফলে একেক সময় একেক বয়ান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তিত হয়েছে, আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে দ্বিধা ও বিভ্রান্তির মধ্যে। একটি জাতির জন্য এর চেয়ে বিপজ্জনক অবস্থা আর কী হতে পারে?
ইতিহাসের বিকৃতি ও বিভাজনের ভয়াবহ পরিণতি: বিশ্ব ইতিহাসে এমন বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে, যেখানে ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিভাজন রাষ্ট্রকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে।
যুগোস্লাভিয়া একসময় ছিল একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র। কিন্তু জাতিগত ও ঐতিহাসিক পরিচয় নিয়ে বিভক্তি ক্রমেই সহিংসতায় রূপ নেয়, যার পরিণতিতে রাষ্ট্রটি ভেঙে কয়েকটি দেশে পরিণত হয়। একইভাবে রুয়ান্ডা-তে হুতু ও তুতসি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজন ও ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যা ১৯৯৪ সালে ভয়াবহ গণহত্যার জন্ম দেয়। লিবিয়া কিংবা সিরিয়ার বর্তমান অস্থিরতাও আমাদের মনে করিয়ে দেয়-অভ্যন্তরীণ বিভক্তি যখন চরমে পৌঁছে, তখন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব পর্যন্ত হুমকির মুখে পড়ে।
এই উদাহরণগুলো আমাদের জন্য সতর্কবার্তা-স্বাধীনতা হারানো সবসময় বাইরের আক্রমণে হয় না; তা ভেতরের বিভাজনের মাধ্যমেও ধীরে ধীরে হয়।
রক্তের ঋণ ও স্বাধীনতার মূল্য হেলায় হারানোর নয়: বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো কূটনৈতিক সমঝোতার ফল নয়; এটি নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফসল। লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ, অসংখ্য নারীর সম্ভ্রমহানি, কোটি মানুষের ত্যাগ-এই সবকিছুর বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে স্বাধীনতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়-যে স্বাধীনতা এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত, তা রক্ষা করতে হলে আরো বেশি প্রজ্ঞা, ঐক্য এবং দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।
বিশ্বের বহু জাতি দীর্ঘ সংগ্রামের পর স্বাধীনতা অর্জন করেও তা ধরে রাখতে পারেনি-কারণ তারা নিজেদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে। আবার এমন উদাহরণও আছে, যেখানে রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলা হয়েছে, ফলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশের সামনে আজ সেই পথ বেছে নেওয়ার সময়- রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও জাতীয় স্বার্থে ঐক্য গড়ে তোলা।
রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, রাষ্ট্রিক প্রজ্ঞার সময়: বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় সংকট হলো-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইতিহাসের প্রশ্নে গিয়ে থেমে নেই; তা রাষ্ট্রের কাঠামো ও ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করছে। জনগণ বারবার একটি সীমাবদ্ধ বিকল্পের মধ্যে আটকে যাচ্ছে, ফলে রাজনীতিতে আস্থা কমছে। এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হবে; যা ভবিষ্যতে অনাকাঙিক্ষত শক্তির উত্থানের পথ খুলে দিতে পারে। ইতিহাস বলে, এই ধরনের শূন্যতা কখনোই স্থায়ীভাবে শূন্য থাকে না-তা পূরণ হয় এমন শক্তি দিয়ে, যারা অধিকাংশ সময় গণতান্ত্রিক ধারার বাইরে অবস্থান করে।
প্রয়োজন জাতীয় সমঝোতা: এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে কিছু নীতিনির্ধারণমূলক পদক্ষেপ জরুরি-
১. স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রাতিষ্ঠানিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা: একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ জাতীয় ইতিহাস কমিশন গঠন করে দলিল, সাক্ষ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে একটি সর্বজনগ্রহণযোগ্য ইতিহাস নির্ধারণ করতে হবে।
২. নেতৃত্বের সম্মিলিত স্বীকৃতি: শেখ মুজিবুর রহমান-এর ঐতিহাসিক নেতৃত্ব এবং জিয়াউর রহমান-এর আন্তর্জাতিক প্রচারে ভূমিকা-উভয়কে স্বীকার করা একটি পরিণত রাষ্ট্রের পরিচয়।
৩. পাঠ্যপুস্তকে স্থিতিশীলতা ও সত্য প্রতিষ্ঠা: শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে একটি নির্ভুল ইতিহাস প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
৪. নীতিনির্ভর রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা: ইতিহাসের প্রশ্নে বিভাজন না করে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সুশাসনের প্রশ্নে প্রতিযোগিতা গড়ে তুলতে হবে।
ঐক্যই স্বাধীনতার একমাত্র রক্ষাকবচ: বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়নের সম্ভাবনা, অন্যদিকে বিভাজনের ঝুঁকি। আমাদের সামনে দুটি পথ-একটি বিভক্তির, অন্যটি ঐক্যের। প্রথমটি আমাদের দুর্বল করবে, দ্বিতীয়টি আমাদের শক্তিশালী করবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে-স্বাধীনতা একবার হারালে তা পুনরুদ্ধার করা ইতিহাসে কখনোই সহজ হয়নি।
অতএব, আজকের এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক-ইতিহাসের লড়াই থামিয়ে সত্যের ভিত্তিতে ঐক্য গড়ে তোলা। কারণ, যে স্বাধীনতা রক্তে অর্জিত, তা বিভক্তির রাজনীতির কাছে পরাজিত হলে-তা হবে শুধু একটি রাষ্ট্রের পরাজয় নয়, একটি জাতির আত্মার পরাজয়।
লেখক: সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিককর্মী
সানা/আপ্র/২৬/৩/২০২৬