গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

মেনু

এক বহুমাত্রিক সঙ্গীতপ্রতিভা কিংবদন্তি সুরসম্রাজ্ঞীর অনন্তযাত্রা

বিনোদন ডেস্ক

বিনোদন ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২:০৬ পিএম, ১২ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ২৩:২৫ এএম ২০২৬
এক বহুমাত্রিক সঙ্গীতপ্রতিভা কিংবদন্তি সুরসম্রাজ্ঞীর অনন্তযাত্রা
ছবি

৯২ বছর বয়সে রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুরসম্রাজ্ঞী আশা ভোঁসলে -ছবি সংগৃহীত

ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে যিনি একা হাতে বহুমাত্রিক সুরের জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, সেই কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই। ৯২ বছর বয়সে তিনি রোববার মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

হাসপাতাল সূত্র ও ভারতীয় গণমাধ্যম জানায়, ফুসফুসে সংক্রমণজনিত জটিলতায় তিনি ভর্তি ছিলেন। অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকায় শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তার জীবনাবসান ঘটে। মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই সংগীতাঙ্গন, চলচ্চিত্র জগৎ এবং কোটি ভক্তের হৃদয়ে নেমে আসে শোকের গভীর ছায়া।


আট দশকের সঙ্গীত ইতিহাস: আশা ভোঁসলের সংগীতযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকের শেষ দিকে। ১৯৪৩ সালে পারিবারিক পরিবেশে সংগীতচর্চার ভেতর দিয়ে তার যাত্রা শুরু হলেও ১৯৪৮ সালে মারাঠি চলচ্চিত্রে প্রথম প্লেব্যাকের মাধ্যমে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন।

পরের বছর ১৯৪৯ সালে হিন্দি চলচ্চিত্রে একক কণ্ঠে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে মূলধারার সংগীতে জায়গা করে নেন। শুরুতে তিনি বি-গ্রেড ও সহায়ক চরিত্রের চলচ্চিত্রে বেশি গান গাইলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে হয়ে ওঠেন নায়িকাদের অন্যতম প্রধান কণ্ঠ।

প্রায় আট দশকজুড়ে তিনি ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন। তার গাওয়া গানের সংখ্যা ১১ হাজারেরও বেশি, যা তাকে বিশ্ব সংগীত ইতিহাসে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

লতা মঙ্গেশকরের ছায়া থেকে নিজস্ব আকাশ: কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর তার বড় বোন হওয়ায় শুরুতে আশা ভোঁসলে প্রায়ই তুলনার মুখে পড়তেন। তবে তিনি সচেতনভাবেই নিজের জন্য আলাদা পথ বেছে নেন।

যেখানে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় ও সুরেলা মেলোডির প্রতীক, সেখানে আশা ভোঁসলে নিজের কণ্ঠে নিয়ে আসেন আধুনিকতা, ক্যাবারে, রিদমিক বিট ও পরীক্ষামূলক সংগীতের ধারা। এই সিদ্ধান্তই তাকে আলাদা পরিচিতি এনে দেয়। তিনি ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থানে পৌঁছান, যেখানে তিনি আর কারও “ছায়া” নন-বরং নিজেই এক স্বতন্ত্র সংগীত-সাম্রাজ্যের রানি।

আর ডি বর্মনের সঙ্গে সুর বিপ্লব: আশা ভোঁসলে ও সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মনের যুগলবন্দি ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। পশ্চিমা যন্ত্রসংগীত, নতুন রিদম, জ্যাজ ও ডিস্কো প্রভাবিত সুরের সঙ্গে তার কণ্ঠ মিলে তৈরি হয় এক নতুন যুগ। ‘দম মারো দম’, ‘মেহবুবা মেহবুবা’, ‘পিয়া তু আব তো আ জা’-এসব গান শুধু জনপ্রিয়তাই পায়নি, বরং ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের ভাষাই বদলে দেয়। এই যুগলবন্দি আজও সংগীতবোদ্ধাদের কাছে “সোনালি অধ্যায়” হিসেবে বিবেচিত।

বহুমাত্রিক কণ্ঠের বিস্ময়: আশা ভোঁসলে ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি এক কণ্ঠে বহুবিধ অনুভূতির প্রকাশ ঘটাতে পারতেন। তিনি গেয়েছেন- * শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা * লোকগীতির সরলতা * গজলের আবেগ * ক্যাবারের উত্তেজনা * আধুনিক পপ ও রিমিক্স ধারা
‘ঝুমকা গিরা রে’, ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে’, ‘দিলো চিজ কেয়া হ্যায়’, ‘ভোমরা বড়া নাদান’-প্রতিটি গানই ভিন্ন ভিন্ন সময়ের সাংস্কৃতিক চিহ্ন হয়ে আছে।

ভাষা ও সীমানা পেরোনো শিল্পী: তিনি শুধু হিন্দি সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। মারাঠি, বাংলা, তামিল, ইংরেজিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন। বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় তার গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। রেডিও, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রে তার কণ্ঠ একসময় ছিল অপরিহার্য অংশ। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন উপমহাদেশীয় সংগীতের এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন।

ব্যক্তিজীবনের সংগ্রাম ও ভাঙাগড়া: আশা ভোঁসলের জীবন ছিল উত্থান-পতনে ভরা এক দীর্ঘ অধ্যায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পারিবারিক অমতে গণপতরাও ভোঁসলেকে বিয়ে করেন তিনি। সেই সংসার পরবর্তীতে বিচ্ছেদে শেষ হয়। ১৯৮০ সালে তিনি সংগীত পরিচালক রাহুল দেব বর্মনকে বিয়ে করেন। এই সম্পর্ক তার জীবনে নতুন শান্তি নিয়ে এলেও ১৯৯৪ সালে রাহুল দেব বর্মনের মৃত্যু তাকে আবারো এক গভীর শূন্যতায় ফেলে দেয়। এর পাশাপাশি তিনি জীবনে দুই সন্তানকে হারান-একজন কন্যা ও একজন পুত্র। এই ব্যক্তিগত শোকের মধ্যেও তিনি সংগীতকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলেন।

শেষ দিন পর্যন্ত সুরে বাঁধা জীবন: বয়স নব্বই পেরিয়েও তিনি সংগীতচর্চা বন্ধ করেননি। নিয়মিত রেওয়াজ, স্টুডিওতে কাজ এবং মঞ্চে উপস্থিতি ছিল তার জীবনের অংশ। তিনি একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সংগীতই তার শ্বাস। কখনো ভোরে, কখনো রাতে-যখনই সুযোগ পেতেন, তানপুরা নিয়ে বসে যেতেন রেওয়াজে। এই নিষ্ঠাই তাকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সক্রিয় রেখেছিল।

সম্মাননা ও অর্জনের ঝুলি: আশা ভোঁসলে ভারতীয় সংগীতজগতে পেয়েছেন সর্বোচ্চ সম্মাননা।
দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণসহ অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে তিনি ভূষিত হন। তিনি দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেন-‘উমরাও জান’ এবং ‘ইজাজত’ চলচ্চিত্রের জন্য। ফিল্মফেয়ার পুরস্কারও তার ঝুলিতে বহুবার এসেছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি গ্র্যামি মনোনয়নও পেয়েছেন।

রুনা লায়লার আবেগঘন স্মৃতি: বাংলাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা তার মৃত্যুর খবরে ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, আশাজির সঙ্গে তার সম্পর্ক শুধু সহশিল্পীর ছিল না, ছিল গভীর আন্তরিক বন্ধুত্বের। একটি আন্তর্জাতিক রিয়েলিটি শোতে বিচারক হিসেবে একসঙ্গে কাজ করার পর তাদের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, আড্ডা ও স্মৃতির বন্ধনে তারা জড়িয়ে পড়েন। রুনা লায়লার ভাষায়, “এমন শিল্পী আর জন্মাবে না”-এই শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

সংগীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা: আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে শুধু একজন শিল্পীর বিদায় ঘটেনি, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান ঘটেছে। তার কণ্ঠে যেমন ছিল আনন্দ, তেমনি ছিল বেদনা; যেমন ছিল আধুনিকতা, তেমনি ছিল ঐতিহ্য। এই বহুমাত্রিকতার কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য প্রতিষ্ঠান। আজ তিনি নেই, কিন্তু তার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি রয়ে যাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে-সুরের আকাশে চিরকাল জ্বলবে আশা ভোঁসলে নামের এক অমর নক্ষত্র।
সানা/আপ্র/১২/৪/২০২৬

 

 

সংশ্লিষ্ট খবর

পহেলা বৈশাখে তিন কনসার্টে ঢাকা মাতাবে ‘চিরকুট’
১২ এপ্রিল ২০২৬

পহেলা বৈশাখে তিন কনসার্টে ঢাকা মাতাবে ‘চিরকুট’

পহেলা বৈশাখকে ঘিরে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত তিনটি কনসার্টে গান শোনাবে জনপ্রিয় ব্যান্ড চিরকুট। তাদ...

কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই
১২ এপ্রিল ২০২৬

কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আর নেই

ভারতীয় সংগীতজগতের অমর কণ্ঠস্বর, কিংবদন্তি গায়িকা আশা ভোঁসলে আর নেই। ৯২ বছর বয়সে তিনি পৃথিবীর মায়া...

‘রবীন্দ্রপদক’ পেলেন অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন
১২ এপ্রিল ২০২৬

‘রবীন্দ্রপদক’ পেলেন অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন

‘রবীন্দ্রপদক’ ও গুণিসম্মাননা পেয়েছেন অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন।শনিবার (১১ এপ্রিল) জাতীয় রবীন্দ্রসঙ্গীত...

কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোসলে হাসপাতালে, অবস্থা সংকটাপন্ন
১২ এপ্রিল ২০২৬

কিংবদন্তি শিল্পী আশা ভোসলে হাসপাতালে, অবস্থা সংকটাপন্ন

অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বর্ষীয়ান ভারতীয় সংগীতশিল্পী আশা ভোসলে। শনিবার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

মতামত জানান

‘অসম ও দেশবিরোধী’ মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। আপনি কি এই দাবির সঙ্গে একমত?

মোট ভোট: ২ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে