মোস্তফা হোসেইন: গেজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে আট শতাধিক মানুষ নিহত হয় আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আন্দোলনে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ওই বছরের ৮ আগস্টের পরের মৃত্যুসহ এই সংখ্যা প্রায় ১৪শ’। সঙ্গত কারণেই মানুষ ক্ষুব্ধ এই হত্যাকাণ্ডে। আগামী দিনে এই হত্যাকাণ্ডের ওপর নিশ্চিতভাবে গবেষণা-বিশ্লেষণ হবে। কিন্তু যারা ২০২৪ এর এই হত্যাদৃশ্য দেখেছেন, তাদের অধিকাংশই ১৯৭১ এর গণহত্যা দেখেনি। তাদের পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয় শুধু ২৫ মার্চ রাতেই অর্ধলক্ষের বেশি মানুষকে খুন করেছে পাকিস্তানি হারমাদ বাহিনী। এবং পুরো মুক্তিযুদ্ধকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে ৩০ লাখ মানুষকে।
আর এত বড় গণহত্যার সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে কখনও প্রত্যক্ষ কখনও পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তানিদের সহযোগিতাকারী, মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী ও পিডিপির মতো রাজনৈতিক দলগুলোর সদস্যরা। ২৫ মার্চ থেকেই উল্লিখিত দলগুলো ছাড়াও বিহারিরা সরাসরি পাকিস্তানি বাহিনির সঙ্গে মিলে খুনের কাজে অংশগ্রহণ করে। পরবর্তীকালে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো রাজাকার বাহিনী গঠন করে বাঙালি নিধনে অংশ নেয়। মাওলানা এ কে এম ইউসুফ প্রতিষ্ঠিত রাজকার বাহিনী ছিল তাদের অন্যতম। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত আলবদর বাহিনী বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যার মাধ্যমে তাদের নৃশংসতার মিশন শেষ করে। যদিও বিহারিরা ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে পরাস্ত হয়। ১৯৭১ সালে সংঘটিত এই গণহত্যার ব্যাপকতা এবং বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানবতা বিরোধিতার এই অবস্থাকে বাংলাদেশ ও বিশ্ব ইতিহাসে যথাযথ স্থান করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন গণহত্যা দিবসকে স্বীকৃতি দেওয়া- যা স্বাধীনতা লাভের ৫৪ বছর পরও সম্ভব হয়নি।
বলা প্রয়োজন, ১৯৭১ সালের পুরো অংশই ছিল গণহত্যাকাল। কিন্তু ব্যাপক আকারে একবারে বেশি খুন হয় ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর অপারেশন সার্চলাইট মাধ্যমে। আর এ কারণেই ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে স্মরণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সত্যটিকে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে সময় লেগেছে ৪৬ বছর। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস হিসেবে পালিত হবে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অন্যতম দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘ মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ইতোপূর্বে। একইভাবে গণহত্যা দিবসটিও আন্তর্জাতিক মর্যাদা পাওয়ার দাবি রাখে। এই বিষয়ে বাংলাদেশ কয়েকবছর ধরে উদ্যোগ নিলেও কাজটা এই মুহূর্তে জটিল হয়ে পড়েছে। কারণ এর আগেই ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৯তম সভায় ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা হয়ে গেছে। প্রস্তাবক ছিল ছোট দেশ আর্মেনিয়া। জাতিসংঘ মাধ্যমে এই মুহূর্তে আবার ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণার সুযোগ ক্ষীণতর হয়ে পড়েছে। আর্মেনিয়ার গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে দেশটিকে প্রায় ১০০ বছর চেষ্টা করতে হয়েছে। উল্লেখ্য, যেকোনও দিবসকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করতে হলে প্রথম শর্ত হচ্ছে- দিবসটি সংশ্লিষ্ট দেশে আগে স্বীকৃতি পেতে হবে এবং পালন করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এই নৃশংসতার ঘটনাটি স্বীকৃতি পেতে ৪৮ বছর সময় নিয়েছে। তারপর সংসদে অনুমোদনের পর সেটি জাতীয়ভাবে পালন হতে থাকে। যদিও এর আগে থেকেই শহীদ মিনার এবং গণহত্যার কিছু স্থানে মোমবাতি প্রজ্জলনের মাধ্যমে দিবসটি পালন হতো বিচ্ছিন্নভাবে।
ইতিহাসের নৃশংস এই ঘটনাটিকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশের মানুষকে দাবি জানাতে হয়েছে। আর সেই দাবিটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রথম উত্থাপিত হয় ২০০৫ সালে এসে। তারপরও এক যুগ পেরিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশে সরকারি স্বীকৃতি পাওয়া গেছে। এখন অন্তত বাংলাদেশে বিশ্বাসী কারও দিবসটি সম্পর্কে দ্বিমত থাকার কথা নয়। ২০০৫ সালে ইউনেস্কোতে প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয় বেসরকারিভাবে। একইসঙ্গে যদি আন্তর্জাতিকভাবে গবেষক, আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংগঠন, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদদের নৃশংসতা সম্পর্কে জানানো যেত, তাহলে হয়তো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতো।
দূতাবাসগুলো প্রাথমিক কাজ হিসেবে বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবী সাংবাদিকসহ বিভিন্ন মহলে ২৫ মার্চের গণহত্যা সম্পর্কে জানাতে পারে। এটা বিশাল কোনো কর্মযজ্ঞের ব্যাপার নয়। দূতাবাসগুলোকে রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনেই বিভিন্ন দেশের বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। বিভিন্ন দূতাবাসে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের মতো দিবসগুলো উদযাপনও করে আসছে। এখন সেসব দিবসের সঙ্গে গণহত্যা দিবসটিও পালনের ব্যবস্থা করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকরা ইতোমধ্যে বলেছেন, জাতিসংঘ মাধ্যমে গণহত্যা দিবসের স্বীকৃতি আদায় করা এই মুহূর্তে প্রায় অসম্ভব। তবে তাদেরই বলতে শোনা যায়, যদি গোটা একাত্তরের নৃশংসতা এবং যুদ্ধাপরাধের বিষয়টিকে উপজীব্য করে একটি দিবস উদযাপনের চেষ্টা করা হয়, তাহলে হয়তো সফল হওয়া সম্ভবও হতে পারে।
সেখানেও আন্তর্জাতিক মহলে একাত্তরের গণহত্যা সম্পর্কে জানাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষকদের মতে, ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে উদযাপনের সুযোগ আছে। এখানেও সেই দেশে ও দেশের বাইরে কূটনৈতিক পর্যায়ের ভূমিকা জরুরি। একাত্তরে যেসব দেশ বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে, যেসব দেশ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেছে, তাদের মাধ্যমে বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপনের চেষ্টা তো হতে পারে।
আসলে উদ্যোগ নিলে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত তৈরিতে সাফল্য আসতে পারে। গণহত্যা দিবসের অর্থ বহন করে ভিন্ন নামে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু এখনও আছে।
ব্যাপকতর গণহত্যার বিষয়টি বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সংগঠন ‘লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশন’ এবং ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলারস-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি মিলেছে। এখন প্রয়োজন জাতিসংঘের স্বীকৃতিও। আশার কথা, গত ২০ মার্চ ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো হত্যাযজ্ঞকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। প্রস্তাবে তিনি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। প্রস্তাবে বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু হওয়া অপারেশন সার্চলাইট-এর সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের ইসলামপন্থী সহযোগীরা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এতে সব ধর্মের বাঙালিরা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হলেও বিশেষভাবে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নিধনযজ্ঞ চালানো হয়। প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর ১৯৭১ সালের অভিযান জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যার মধ্যে পড়ে। এই স্বীকৃতি অনেক আগেই দেওয়া উচিত ছিল।’ (প্রথম আলো,২০ মার্চ ২০২৬)
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ইতোপূর্বে ভারত, নেপাল ও ভূটান সরকারকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছিল। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরণের আরো উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। দেশের ভিতরেও বর্তমান প্রজন্মকে একাত্তরের গণহত্যা সম্পর্কে জানানোর উদ্যোগ নিতে হবে।
একাত্তরের গণহত্যায় ৩০ লাখ প্রাণহানী ঘটেছে। এত বড় নৃশংসতা ও জাতীয় ক্ষতিকে উপেক্ষা করে অন্য গণহত্যা কিংবা নৃশংসতাকে গুরুত্ববহ করার চেষ্টা করা হলে- সেই চেষ্টা শুধু বিতর্কেরই জন্ম দেবে। একটা দেশের জন্য এত মানুষের আত্মদানকে স্বীকার না করলে মানবাধিকারকেও অমান্য করা হয়। নিশ্চয়ই আমরা সেরকম কিছু করতে পারি না।
লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক
সানা/আপ্র/২৬/৩/২০২৬