মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক হামলা ও চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়ে দেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে অনিশ্চয়তা আরো তীব্র হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেল নিতে ভোগান্তির চিত্র ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।
ঈদের ছুটি শেষে কর্মজীবী মানুষের ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। ফলে জ্বালানি তেলের চাহিদা হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে। শনিবার সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পাম্পে দেখা যায় দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে আছে ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ নানা যানবাহন। দিন-রাত নির্বিশেষে একই চিত্র বিরাজ করছে।
রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশন, আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন এবং সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পাম্পের সামনে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের লাইন। অনেক চালক গাড়ির ভেতরে বসে অপেক্ষা করছেন, কেউবা লাইনে রেখে বাইরে হাঁটছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন না। অধিকাংশ পাম্পে নির্দিষ্ট পরিমাণে রেশনিং করে তেল দেওয়া হচ্ছে।
আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সড়কে লম্বা লাইন দেখা গেছে। ট্রাস্ট ফুয়েল স্টেশনের লাইন গিয়ে পৌঁছেছে মহাখালীর কাছাকাছি এলাকায়। চালকদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ-‘আর কত অপেক্ষা করতে হবে জ্বালানির জন্য?’
অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার: ময়মনসিংহে ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ, জরিমানা: জ্বালানি সংকটের মধ্যে অবৈধ মজুত রোধে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। জেলার ফুলপুর উপজেলায় একটি পেট্রোল পাম্পে অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে মজুত করা ২৪ হাজার লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়েছে।
শনিবার দুপুরে পয়ারী রোডের আমুয়াকান্দা এলাকায় ‘মেসার্স পপি ট্রেডার্স’ নামের একটি মিনি পাম্পে অভিযান চালানো হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে পাম্পের বিভিন্ন সংরক্ষণ ট্যাংক থেকে ৪ হাজার ৫০০ লিটার পেট্রোল ও ১৯ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল উদ্ধার করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পাম্প মালিককে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পরে জব্দ করা তেল সাধারণ জনগণের কাছে বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রশাসন জানিয়েছে, জ্বালানি সংকট নিরসনে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এর আগে হালুয়াঘাটেও অভিযান চালিয়ে ২৩০ লিটার জ্বালানি জব্দ করা হয়।
জামালপুরে বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ: তেল মজুত রেখে বিক্রি না করার অভিযোগে জামালপুরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ মোটরসাইকেল চালকরা মহাসড়ক অবরোধ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হস্তক্ষেপ করে প্রশাসন। শনিবার সকালে শহরের পিটিআই মোড়ে ‘জুঁই এন্টারপ্রাইজ’-এ তেল নিতে এসে শতাধিক বাইকার লাইনে দাঁড়ান।
অভিযোগ ওঠে, রাতে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ এলেও তা বিক্রি না করে গোপনে মজুত করে রাখা হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে সকাল ৯টার দিকে জামালপুর-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। পরে প্রশাসন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিতে তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশিতে ১২টি ড্রামে প্রায় ২ হাজার ৮০০ লিটার তেল মজুত অবস্থায় পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং মজুত তেল তাৎক্ষণিকভাবে বিক্রির নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রশাসনের আশ্বাসে অবরোধ তুলে নিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
সরবরাহে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ: দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ডিপো থেকে তেল খালাসের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ডিপো থেকে জ্বালানি পণ্য সরবরাহ কার্যক্রম চলবে।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। দেশের সব ফিলিং স্টেশন, ডিলার ও পাম্পে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই নতুন সময়সূচি কার্যকর করা হয়েছে।
অবৈধ মজুত ও অতিরিক্ত ক্রয় থেকে বিরত থাকার আহ্বান: সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত ঘাটতি নেই। তবে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রচারণায় জনগণকে অতিরিক্ত তেল ক্রয় না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল অত্যন্ত দাহ্য পদার্থ-এসব অবৈধভাবে মজুত করা বিপজ্জনক।
সরকার জানিয়েছে, জ্বালানি তেলের মূল্য এখনো বাড়ানো হয়নি এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রয়োজনীয় তেল আমদানি অব্যাহত রয়েছে। প্রতিটি জেলায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কাজ করছে।
প্রচারণায় আরো বলা হয়েছে, ‘নিজে সাবধান হই, অন্যকেও সাবধান করি’-অবৈধ মজুত রোধে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/৩/২০২৬