মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের চলমান যুদ্ধ নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক মাসের মাথায় এই সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হতে শুরু করেছে ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা। তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ শুধু ইসরায়েলের জন্য নতুন সামরিক চাপই তৈরি করছে না, বরং বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতেও ভয়াবহ অচলাবস্থার আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
ইসরায়েলের জন্য নতুন চাপ: গাজা যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তেমন কার্যকর ছিল না। অধিকাংশ হামলাই মাঝপথে প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছিল।
তবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন ঘটে। ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুতি ড্রোন তেল আবিবের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানলে একজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রথমবারের মতো ইয়েমেন থেকে ইসরায়েল লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। এতে স্পষ্ট হয়েছে, সংঘাত এখন বহুমাত্রিক রূপ নিচ্ছে।
লোহিত সাগরে নতুন আশঙ্কা: সুয়েজ খালও ঝুঁকিতে: হুতিদের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের নৌপথে হামলার সক্ষমতা। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের শুরু পর্যন্ত তারা লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজে প্রায় ২০০টি হামলা চালিয়েছে। এতে ৩০টির বেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অন্তত একটি জাহাজ ছিনতাই করা হয়।
এই হামলার কারণে বাব আল-মানদাব প্রণালি ও সুয়েজ খাল দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। বর্তমানে সৌদি আরব ইয়ানবু বন্দর হয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে, যা ইয়েমেন উপকূল ঘেঁষে যায়। হুতিরা যদি আবার এই পথে হামলা শুরু করে, তবে জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে। বিশ্লেষকদের মতে, বাব আল-মানদাব প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে লোহিত সাগর হয়ে সুয়েজ খালে প্রবেশ কার্যত অচল হয়ে পড়বে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের শঙ্কা: দ্বৈত আঘাতে বিশ্ব বাণিজ্য: চলমান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালিকে ইতিমধ্যে কৌশলগত চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইরান। এই সরু জলপথের আশপাশে প্রায় দুই হাজার জাহাজ আটকা পড়ার খবর পাওয়া গেছে। যদি ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয় এবং একই সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের পথ বন্ধ করে দেয়, তাহলে বিশ্ব বাণিজ্যের দুই প্রধান নৌপথ একযোগে অচল হয়ে পড়বে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।
লেবানন ফ্রন্টে তীব্র লড়াই, হিজবুল্লাহর সক্রিয়তা: ইরান-ইসরায়েল সংঘাত এখন লেবানন সীমান্তে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে সরাসরি স্থলযুদ্ধ চলছে। ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলায় একাধিক ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তারা ইসরায়েলি ট্যাংক ধ্বংস করেছে এবং সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার ভেতরে অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সীমান্তজুড়ে অন্তত ৮২টি অভিযান চালানোর কথাও জানিয়েছে তারা। এতে যুদ্ধের তীব্রতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এক মাসের যুদ্ধে মৃত্যু ও ধ্বংসের হিসাব: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধে এক মাসে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ইরানে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০। লেবাননে নিহত ১ হাজার ১৪২ জন, যার মধ্যে ১২২টি শিশু রয়েছে। গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত নিহত ৭২ হাজার ২৬৭ জন। পশ্চিম তীরেও সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৯ জন। ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৩ সেনা নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হয়েছেন।
ইরানে হামলা, পাল্টা হুঁশিয়ারি: ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে। পারমাণবিক স্থাপনা, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পকারখানাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। ইরান এসব হামলাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে হুঁশিয়ারি দিয়েছে-এর জন্য ‘চড়া মূল্য’ দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও সামরিক প্রস্তুতি: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে হামলার জন্য এখনো হাজারো লক্ষ্যবস্তু প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চাপ দিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়া উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি ইরানে সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা যুদ্ধকে আরো জটিল করে তুলতে পারে। সৌদি আরবে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেনা আহত হয়েছেন। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় রাডার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ঘটনা সংঘাতের বিস্তারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় আশার আলো ক্ষীণ: যুদ্ধ থামাতে বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হয়েছে। পাকিস্তানের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ইরান। উভয় পক্ষই আলোচনার জন্য আস্থা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের কাছে একাধিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং দ্রুত বৈঠকের আশা করছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
আঞ্চলিক যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক সংকট: হুতিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ইসরায়েলের জন্য এটি নতুন সামরিক চ্যালেঞ্জ হলেও, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায়। হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর-এই দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ যদি একসঙ্গে অচল হয়ে পড়ে, তবে তার প্রভাব পড়বে পুরো বিশ্বের অর্থনীতিতে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ এখন শুধু সীমান্তের লড়াই নয়-এটি ক্রমেই বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/৩/২০২৬