অজয় দাশগুপ্ত: বাঙালির যূথবদ্ধ জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অভিজ্ঞান হলো উৎসব। আমাদের এই ব-দ্বীপে ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ কেবল লোকজ বচন নয়, এক শাশ্বত জীবনধারা। সময়ের বিবর্তনে সব ছাপিয়ে ঈদ আজ এদেশের সর্ববৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে। এবারের ঈদের বিশেষত্ব হলো-এটি এসেছে এমন এক মাসে, যখন আমরা আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি অর্থাৎ স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করি। উৎসবের আনন্দ আর স্বাধীনতার গৌরব, এই দুই সমান্তরাল ধারা আজ আমাদের হৃদয়ে একাকার-দুটোই আমাদের পরম প্রিয়।
একটি অনস্বীকার্য সত্য আমাদের মেনে নিতেই হবে যে, বাঙালির সামষ্টিক জনজীবনে ধর্মভিত্তিক উৎসবগুলোই এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ উদযাপনের স্থান দখল করে আছে। রাজনীতির কলুষতা সরিয়ে রাখলে দেখা যায়, ধর্মই আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির অমোঘ বার্তাবাহক হিসেবে কাজ করে। তবে শুধু উৎসবের আমেজে গা ভাসালে চলবে না; সংকটের মূলে করাঘাত না করলে কিংবা অপ্রিয় সত্য উচ্চারণে কুণ্ঠাবোধ করলে ব্যাধির উপশম কখনোই সম্ভব নয়। বর্তমানে আমরা এক ধরনের বায়বীয় মূল্যবোধ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৃত্রিম আবরণে সত্যকে ঢেকে রাখছি। এই লুক্কায়িত সত্যের সন্ধান আজ যদি আমরা করতে না পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে জাতিকে এর জন্য চরম চড়া মূল্য দিতে হবে।
আমার কৈশোরের স্মৃতিতে আজও অমলিন হয়ে আছে স্বাধীনতা অর্জনের সেই উত্তাল দিনগুলো। সেই সময়ে যে দুর্মর দেশপ্রেম আর পাকিস্তানিদের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্যের প্রতি পুঞ্জীভূত ঘৃণায় সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার অবিনাশী প্রেরণা আর নেতৃত্বের অগ্রভাগে ধ্রুবতারার মতো দীপ্যমান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
ইতিহাসের সেই উত্তাল দিনগুলোতে রণক্ষেত্রে অসামান্য ধীশক্তি আর সংকল্প নিয়ে ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের মতো কালজয়ী নেতারা। ময়দানে অকুতোভয় লড়াকু হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিল তরুণ অগ্রজ আর দীপ্যমান নারী সমাজ। তবে সেই রক্তঝরা দিনগুলোর নেপথ্য শক্তি ছিল এদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ, যারা মূলত ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণী শক্তি বা এক অমোঘ ‘ডিটারমিনার’ হিসেবে কাজ করেছে। তারা সরাসরি রণক্ষেত্রে ঝুঁকি না নিলেও হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধের লালন করেছিলেন বলেই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় সম্ভব হয়েছিল। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন যখন বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু একটি অনিচ্ছুক জাতিকে স্বাধীন করে গেছেন’-আমি সেই ভাষ্যের সাথে ভিন্নমত পোষণ করি। আমার বিচারে, জাতিটি ‘অনিচ্ছুক’ ছিল না, বরং ছিল এক গভীর ‘দোদুল্যমানতায়’ আচ্ছন্ন; বঙ্গবন্ধু তার সম্মোহনী নেতৃত্বে সেই দ্বিধাগ্রস্ত জনতাকে একটি অভিন্ন ও সঠিক লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করতে পেরেছিলেন।
কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, সেই দোদুল্যমান পেন্ডুলামের কাঁটাটি আজ অর্ধশতক পেরিয়ে পুনরায় সাতচল্লিশের সাম্প্রদায়িক আবহের দিকেই প্রবলভাবে ঝুঁকে পড়ছে। বর্তমানের এই মনস্তাত্ত্বিক সংকটে পাকিস্তান ভাঙার সেই পুরনো বেদনা, উগ্র ধর্মীয় আবেগ আর অন্ধ ভারতবিদ্বেষের মতো জটিল উপাদানগুলো পুনরায় মূর্ত হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আশঙ্কাজনকভাবে যুক্ত হয়েছে ‘সংখ্যালঘু’ অভিধায় পরিচিত ধর্মীয় ও জাতিগত প্রান্তিক মানুষের প্রতি চরম অবজ্ঞা আর অসংবেদনশীলতা, যা আমাদের স্বাধীনতার মূল চেতনাকে সরাসরি আঘাত করছে।
ঢাকায় গল্প-গদ্য লিখে পরিচিত একটি তরুণী বলেছিল তার জীবনের ঘটনা। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মেয়েটির আনুগত্য প্রবল। এই দেশ, এই জাতি, এই সমাজকে আলোকময় দেখতে চায় সে। কখনো ধর্মে-বর্ণে ভাগ করে না কাউকে। ‘বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিষ্টান, বাংলার মুসলমান-আমরা সবাই বাঙালি’-লেখা একটি পোস্টার এনে লাগিয়েছিল ঘরের দেয়ালে। একদিন তার স্বামী প্রবল আক্রোশে সেই পোস্টারটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলে। অসহায় মেয়েটি কারণ জেনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। তার স্বামীর ধারণা, এইসব নাস্তিক মার্কা পোস্টার ঘরে থাকার কারণে তার পাপ হচ্ছে বলেই উন্নতি হচ্ছে না। কবে আমরা এমন বদলে গেলাম? কবে থেকে আমরা এমন জাতিতে পরিণত হলাম? এখন তো এমন অবস্থা যে, আপনি চাইলেও অনেক কথা বলতে পারবেন না। আওয়ামী লীগের দশ শতাংশ নেতাকর্মী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন কি না-এই প্রশ্ন করা যৌক্তিক হলেও আপনি তা করতে পারবেন না।
এত বছর পরও আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে মীমাংসায় আসতে পারিনি। আমরা কি আবার ইতিহাসের সেই অন্ধকার গহ্বরে ফিরে যাচ্ছি, যেখান থেকে জন্ম নিয়েছিল বিভক্তি আর বৈরিতা? একটি জাতি বা দেশ কেবল বাঁশির ফুঁয়ে স্বাধীন হয়-এমন আজগুবি তত্ত্বও এদেশের মানুষ খায়। শুধু খায় না, বিশ্বাসও করে। কাদের সিদ্দিকীর মতো মুক্তিযোদ্ধা, যিনি সবচেয়ে সেরা খেতাব পাওয়া রাজনীতিবিদ, তিনিও এ নিয়ে দ্বন্দ্বে ভোগেন।
অথচ আজকের বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের যৌবনে জন্মভূমি ছিল আরেক ধরনের। আমাদের পোশাকের ঠিক ছিল না। একটি বেলবটম প্যান্ট সেলাই করতে দিয়ে সারারাত জেগেছিলাম সকালে পাব বলে। হাতেগোনা কয়েকটি শার্ট আর দু-এক জোড়া মাঝারি মানের জুতো। আমাদের বাবাদের চশমার কাঁচ খালি পুরু হতো; কপালের ভাঁজ হতো দুশ্চিন্তায় ঘন। যাদের বাড়িতে একাধিক কন্যা, তাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল কীভাবে মেয়ের বিয়ে হবে। চাকরি ছিল সোনার হরিণ।
আজ যারা আমাদের দেশকে উন্নয়নশীল বা সমৃদ্ধ বলছে, সেদিন তাদের চেহারা ছিল ভিন্ন। তারা আমাদের শুধু ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেনি, ফকির-ভিখারি ডাকতেও কসুর করত না। তাদের ফেলে দেওয়া পোশাক-বর্জ্য, দুধ ও ব্যবহৃত প্রসাধনী দিয়ে বড়লোক বা আধুনিক সাজতে হতো আমাদের। আমাদের দেশ টিকবে কিনা, এ নিয়ে কত তত্ত্ব আর কত উপদেশ! বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর এমনও ধারণা করা হয়েছিল যে, পাকিস্তানে ফেরার খুব বেশি দেরি নেই আর; অথবা ছায়া পাকিস্তান হতে চলেছি আমরা।
আজকের বাংলাদেশ আরেক চেহারার। তার গায়ে উন্নয়নের ছোঁয়া। কলকাতা গেলেই বুঝতে পারি কতটা ভালো আছে দেশের মানুষ। সুখ বা শান্তির কথা বলছি না; তাদের পোশাক, খাবার কিংবা জীবনে এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বাংলাদেশে আর যাই থাক, টাকার অভাব নেই। যে টাকা ছিল স্বপ্ন, সে টাকা আজ বাতাসে উড়ছে।
তারপরও কেন এই বাস্তবতা? কেন এখনো সাম্প্রদায়িকতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা? যে তারুণ্য আমাদের পথ দেখাতে পারে, তারা মজে আছে কাওয়ালিতে। কাওয়ালি খারাপ কিছু না। কিন্তু ভাবার বিষয় হচ্ছে এর পেছনে থাকা মানসিকতা, যা আমাদের অতীতকে কলুষিত করতে চায়। এটি আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী হতে প্ররোচিত করে, পাকিস্তানের সঙ্গে মিতালিতে ইন্ধন দেয়, যা স্বাধীনতা আর মুক্তির সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ। পৃথিবীর কোনো জাতি নিজের স্বাধীনতাকে অশ্রদ্ধা বা অসম্মান করার জন্য এক রাষ্ট্র, এক জাতি ও এক পতাকাকে দ্বিতীয়বার ‘স্বাধীন’ বলে চিহ্নিত করে না। অথচ তাই বলা হচ্ছে আমাদের দেশে। এটাই প্রশ্ন এখন-আমরা আসলে কী স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে বিশ্বাসী?
যদি তা হয়, তাহলে কূটতর্ক বন্ধ করতেই হবে। মানতে হবে আওয়ামী লীগের সরকার ১৬ বছরে দেশকে কঠিন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়াতেই এই বিরূপ পরিস্থিতির জন্ম। তারা আজ নেই। তাদের পলায়ন বা চলে যাবার ভেতরেই তাদের পরাজয় নিহিত। এর সঙ্গে আমাদের অর্জন বা ইতিহাসকে মেলানো অনুচিত।
তাই কয়েকটা বিষয়ে তো নিশ্চিত হতে হবে। ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজের চেহারা বা প্রগতিশীলতা-এগুলো আমরা আসলে চাই কিনা? চাইলে হানাহানি বন্ধ করে শান্তিতে থাকার পথ তৈরি হোক। আর না চাইলে কী তার সমাধান, তা ঠিক করুক দেশের বুদ্ধিজীবী, বরেণ্য মানুষেরা বা রাজনীতিবিদেরা। আমরা আমাদের দেশপ্রেম আর স্বদেশের মঙ্গল চাই। তার অপমান আর দেখতে চাই না। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও এগিয়ে চলা নিশ্চিত করতে কেমন দেশ চাই, সেটা ঠিক করা এখন জরুরি।
সানা/আপ্র/২৬/৩/২০২৬