নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রথম ধাপে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেছে সরকার। রাজধানীর কড়াইল ও ভাষানটেক এলাকার ১৫ হাজার নারী প্রধান পরিবারের হাতে মঙ্গলবার (১০ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে এই কার্ড তুলে দেওয়া হয়েছে। কার্ড হাতে পাওয়ার আগেই মোবাইল ফোনে আর্থিক সহায়তার টাকা পৌঁছে যাওয়ায় উচ্ছ্বাসে ভরে ওঠেন সুবিধাভোগীরা।
রাজধানীর বনানী টিঅ্যান্ডটি স্কুল মাঠে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই কর্মসূচির সূচনা করেন। অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারীর হাতে সরাসরি ফ্যামিলি কার্ড তুলে দেওয়ার পাশাপাশি একটি বাটন চাপ দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতিতে উপকারভোগীদের কাছে নগদ সহায়তার অর্থ পাঠানোর কার্যক্রমও উদ্বোধন করেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে উপকারভোগীদের মোবাইলে অর্থ পৌঁছে গেলে করতালিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো অনুষ্ঠানস্থল। সরকার জানায়, এই কর্মসূচির মাধ্যমে নারী প্রধান অতিদরিদ্র পরিবারগুলোকে নিয়মিত আর্থিক সহায়তা ও সুলভ মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের সুযোগ দেওয়া হবে।
পাঁচ বছরে চার কোটি পরিবারকে কার্ড: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি নারী প্রধান দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এবং সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যেই সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “আজকের দিনটি আমার এবং দলের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও আবেগের দিন। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেই সরকারের দায়িত্ব জনগণের কাছে জবাবদিহি করা।”
প্রধানমন্ত্রী জানান, পরীক্ষামূলক কর্মসূচি দিয়ে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে সারা দেশে এই উদ্যোগ সম্প্রসারণ করা হবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশে প্রায় চার কোটি পরিবার রয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সেই চার কোটি পরিবারের নারী প্রধানদের কাছে আমরা ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই।”
নারীর ক্ষমতায়নেই উন্নয়ন: বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পিছিয়ে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “যদি নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করা না যায়, তাহলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।”
নারী শিক্ষা বিস্তারে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকারের সময় স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মেয়েদের জন্য শিক্ষাকে বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে এখন অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল ও আত্মনির্ভর করে তুলতে চায় সরকার।
প্রতিশ্রুতি থেকে সরবে না সরকার: দেশের মানুষের প্রত্যাশা সম্পর্কে সরকার সচেতন বলে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে আসবে না।
তিনি বলেন, “এই দেশ আমাদের প্রথম এবং শেষ ঠিকানা। মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আমরা প্রতিশ্রুতি থেকে বিন্দুমাত্র সরে যাব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অবস্থা এবং ইরান যুদ্ধের কারণে কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবায়নে সময় লাগতে পারে।”
এ অবস্থায় তিনি সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আসুন আমরা ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করি এবং সুন্দরভাবে আমাদের দেশকে গড়ে তুলি।”
কৃষক কার্ডও আসছে: সরকারের অন্যান্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড কর্মসূচির প্রস্তুতিও প্রায় শেষ।
তিনি জানান, আগামী মাস থেকেই কৃষকদের হাতে কৃষক কার্ড তুলে দেওয়া শুরু হবে।
তারেক রহমান বলেন, “আমরা কৃষকদের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে কৃষি ঋণ মওকুফ করব। ইতোমধ্যে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। ধীরে ধীরে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।”
কার্ডের আগেই মোবাইলে টাকা: উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া অনেক নারী জানান, কার্ড হাতে পাওয়ার আগেই মঙ্গলবার সকাল থেকে তাদের মোবাইলে দুই হাজার পাঁচশ টাকা করে জমা হয়েছে।
মরিয়ম নামের এক বিধবা নারী বলেন, তিন বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন কাটছিল। প্রতি মাসে এই সহায়তা তার পরিবারের জন্য বড় সহায় হবে।
হাফসা বেগম নামে আরেক সুবিধাভোগী বলেন, ঈদের আগে এটি তাদের জন্য বড় উপহার। তিনি বলেন, “আমরা জানতাম ফ্যামিলি কার্ড পাব, কিন্তু এত দ্রুত এটি শুরু হবে ভাবিনি।”
অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য নারীরাও একইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন এবং সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিতি: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন, বেদ, ত্রিপিটক ও বাইবেল থেকে পাঠ করা হয়। পরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং সমাজকল্যাণ সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বক্তব্য রাখেন।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, কূটনীতিক এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
মানুষের প্রত্যাশা: সরকারের নতুন এই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি শুরু হওয়ায় উপকারভোগীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। তারা আশা করছেন, ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব দরিদ্র নারী প্রধান পরিবার এই সুবিধার আওতায় আসবে। একই সঙ্গে মানুষের প্রত্যাশা-নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পথ আরো সুদৃঢ় করবে।
সানা/আপ্র/১০/৩/২০২৬