সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রথম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম বছরে মূল বেতন এবং দ্বিতীয় বছরে বাড়িভাড়া ও অন্যান্য ভাতা কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সচিব কমিটির সব সদস্য ইতিমধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশিত ‘জনগণের সরকারের ১৮০ দিন’ শীর্ষক ই-বুকেও নতুন বেতন কাঠামোকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় সুখবর হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে সরকার কাজ করছে এবং বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা চলছে। চলতি বছরের মধ্যেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ-সংক্রান্ত বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আরো কিছু বিষয়ে আলোচনা প্রয়োজন। সব বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকার বিস্তারিত জানাবে।
নতুন বেতন কাঠামোর অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতার জন্য ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও আনুষঙ্গিক সুবিধাসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
প্রায় এক যুগ পর ২০২৫ সালের ২৭ জুলাই ২৩ সদস্যের নবম জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয়। সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়। বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে কমিশন বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ ছিল ওই প্রতিবেদনে।
এরপর সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য গত ২১ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে সভাপতি করে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, অর্থসচিব, জনপ্রশাসনসচিব, আইনসচিব, প্রতিরক্ষাসচিব, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা সচিব, স্বাস্থ্যসেবাসচিব, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার এবং হিসাব মহানিয়ন্ত্রক রয়েছেন।
এর আগে গত ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, প্রায় ১১ বছর ধরে সরকারি চাকরিজীবীরা একই বেতন কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা তিনি জানিয়েছিলেন।
তবে বেতন বাড়ানোর সঙ্গে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন বেতন কাঠামো সরকারি কর্মীদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে পারে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন যেন বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও জীবনযাত্রার বাস্তবতার সঙ্গে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় রাখা জরুরি।
সানা/আপ্র/১৮/৮/২০২৬