দেশের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য প্রায় ২৫ লাখ আসন থাকলেও ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এবার প্রায় ১৩ লাখ ৬১ হাজার আসনই খালি থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী সংকটের ইঙ্গিত নয়; আগামী দুই থেকে তিন বছরে এর প্রভাব উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পড়তে পারে বলে মনে করছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। বিপরীতে একাদশ শ্রেণিতে কলেজ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে আসন প্রায় ২৫ লাখ। অর্থাৎ উত্তীর্ণ সবাই ভর্তি হলেও বিপুলসংখ্যক আসন অব্যবহৃত থেকে যাবে। তবে এই শূন্য আসনের সমসংখ্যক শিক্ষার্থী যে শিক্ষা থেকে ঝরে পড়বে, এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছানোর সুযোগ নেই। কেউ কারিগরি শিক্ষায় যেতে পারে, কেউ বিদেশে পড়তে যেতে পারে, আবার কেউ উচ্চমাধ্যমিকেই পড়াশোনা অব্যাহত নাও রাখতে পারে।
তবু বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার অবকাশ নেই। কারণ ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের বড় অংশ ২০২৮ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেবে। এরপর তাদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাবে। ফলে এবারের কম পাসের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা দিতে পারে ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে।
এখানেই রাষ্ট্রের জন্য বড় নীতিগত প্রশ্নটি সামনে এসেছে-দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও আসন কি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? গত কয়েক বছরে যথাযথ জনমিতিক ও শিক্ষার্থী-চাহিদার হিসাব ছাড়াই অনেক স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত বা অনুমোদিত হয়েছে-বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে এমন উদ্বেগ উঠে এসেছে। অথচ শিক্ষার্থী কমতে থাকলে এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, শিক্ষক, অর্থায়ন ও পরিচালনব্যবস্থার যৌক্তিকতা নতুন করে মূল্যায়ন করতেই হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন মনে করেন, এবার ফলাফল যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মতে, অতীতে ফল ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানোর প্রবণতা ছিল এবং চাহিদার হিসাব ছাড়াই অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। তিনি মনে করেন, শিক্ষার্থী কমার প্রভাব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব বেশি পড়বে না; তবে দুর্বল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সংকটে পড়তে পারে।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধূরীর বক্তব্যেও একই বাস্তবতার প্রতিফলন। তাঁর ভাষায়, শরীরের মাপ অনুযায়ী জামা কাটার মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও শিক্ষার্থীর বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হবে। তাঁর মতে, চাহিদাহীন প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করতে একটি সমীক্ষা প্রয়োজন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দারও শিক্ষার্থী সংকটে দুর্বল কলেজগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নীতিগত সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। প্রয়োজনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একীভূত করার প্রস্তাবও এসেছে।
তবে এই পরিস্থিতির একটি ইতিবাচক দিকও আছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো চাইলে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত উন্নত করতে, গবেষণা বাড়াতে এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় জোর দিতে পারে। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার বিস্তার ঘটানোর এটিই হতে পারে উপযুক্ত সময়।
সুতরাং সাড়ে ১৩ লাখ আসন খালি থাকার ঘটনাকে কেবল ‘আসন সংকটের বিপরীত চিত্র’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি বাংলাদেশের শিক্ষা পরিকল্পনার দীর্ঘদিনের অসামঞ্জস্য পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিষ্ঠান বাড়ানো নয়, বরং জনসংখ্যার প্রবণতা, শিক্ষার্থীর চাহিদা, কর্মবাজার এবং শিক্ষার মান-সবকিছুকে সামনে রেখে একটি জাতীয় শিক্ষা-মানচিত্র তৈরি করা।
আজকের খালি আসন আগামী দিনের উচ্চশিক্ষার সংকট হবে, নাকি শিক্ষাব্যবস্থাকে ছোট, দক্ষ ও মানসম্মত করার সুযোগ হয়ে উঠবে-সিদ্ধান্তটি এখনই নিতে হবে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১৭/৮/২০২৬