একেএম ফজলুল হক: রাতভর টানা ভারী বৃষ্টিতে আবারো ডুবেছে চট্টগ্রাম মহানগরের বিস্তীর্ণ এলাকা। নগরের প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি-কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার পানিতে ভেসেছে দোকানপাট ও বাসাবাড়ির নিচতলা। পানি মাড়িয়ে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নগরবাসী। কোথাও যানবাহন চলেছে ধীরগতিতে, কোথাও গণপরিবহনের সংকটে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। বৃষ্টির সঙ্গে চলমান গ্যাস সংকট যোগ হওয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যাও ছিল কম।
রোববার (১৬ আগস্ট) রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালেও অব্যাহত থাকে। এরই মধ্যে নগরের রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, পাঠানটুলী, নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, জামালখানসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এক মাসের ব্যবধানে ফের এমন পরিস্থিতিতে নগরবাসীর মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এসব এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমার তথ্য উঠে এসেছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৮১ মিলিমিটার। পরে বেলা ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২০১ মিলিমিটারে পৌঁছায় এবং সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয় ১৩৭ দশমিক ২ মিলিমিটার।
আবহাওয়াবিদ মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাব এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর কারণে এ বৃষ্টিপাত হচ্ছে। চট্টগ্রামে আরো দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত হতে পারে।
এদিকে সোমবার সকালে আবহাওয়া অধিদপ্তর ভারী বৃষ্টির সতর্কবার্তা জারি করেছে। সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত নিম্নচাপের প্রভাবে সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর ফলে কোথাও কোথাও অস্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামসহ পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কার কথাও জানানো হয়েছে।
বৃষ্টির পানিতে সড়ক-বাসাবাড়ি, ভোগান্তি চরমে: সোমবার সকাল থেকেই নগরের বিভিন্ন সড়কে পানি জমতে শুরু করে। রাহাত্তারপুল, বাকলিয়া, চকবাজার, নিউমার্কেট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, কাপাসগোলা ও কাতালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি দেখা যায়। জলাবদ্ধতার কারণে সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। আখতারুজ্জামান চৌধুরী ফ্লাইওভারেও পানি জমে এবং ওপর থেকে নিচে পানি পড়তে দেখা যায়।
পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। অনেককে পোশাক গুটিয়ে কিংবা বিকল্প পোশাক পরে কর্মস্থলে যেতে দেখা যায়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ও নিচতলায় পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।
রাহাত্তারপুল এলাকার বাসিন্দা খাদিজা জান্নাত সুজন বলেন, রাত থেকে বৃষ্টি হচ্ছে। সকালে বের হয়ে দেখেন রাস্তায় পানি আরো বেড়েছে। হাঁটুসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। প্রতিবছর বর্ষায় একই ভোগান্তি হলেও এর স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
বাকলিয়ার বাসিন্দা ফকরুল আলম বলেন, সকালে অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তায় অনেক পানি পেয়েছেন। গাড়িও কম ছিল। ফলে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লেগেছে। বৃষ্টির সঙ্গে যানবাহনের সংকট দুর্ভোগ আরো বাড়িয়েছে।
বহদ্দারহাট এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, সড়কে পানি জমে থাকায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের বেশি সমস্যা হচ্ছে; অনেকে পানি মাড়িয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।
‘এত টাকা খরচ করেও জলাবদ্ধতা কমে না’: জলাবদ্ধতার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী। আগ্রাবাদ ও পাঠানটুলী এলাকায় হাঁটুসমান পানির মধ্যে চলাচল করা রিকশাচালক মো. ইব্রাহিম বলেন, তিনি ১২ বছর ধরে চট্টগ্রাম নগরে রিকশা চালান। এই সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন কাজ হতে দেখেছেন। কিন্তু জলাবদ্ধতা কমেনি। এত টাকা খরচ করে তাহলে লাভ কী-এ প্রশ্নও তোলেন তিনি।
পাঠানটুলীর বাসিন্দা সাজ্জাদ রাকিব বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়ে। সারা বছর উন্নয়নকাজ চললেও জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। বৃষ্টি হলে যানবাহনের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর সঙ্গে নগরের অনেক সড়ক ভাঙাচোরা থাকায় পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়। তাঁর ভাষায়, শহরটি ধীরে ধীরে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে।
অফিসগামী রকি হায়দার বলেন, দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামের যদি এমন অবস্থা হয়, তাহলে মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়। জলাবদ্ধতার কারণে তাঁকে অফিসে যেতে পোশাক বদলে লুঙ্গি পরতে হয়েছে। এ ভোগান্তির শেষ কবে হবে, তা তাঁরা জানেন না।
ব্যবসায়ী মোশারফ হোসেন বলেন, ঝড়-বৃষ্টি যাই হোক, তাঁদের অফিসে যেতে হয়। অথচ বাসার নিচে পানি, অফিসের নিচেও পানি। তার ওপর যানবাহনের ভাড়া কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এত উন্নয়ন করেও যদি রাস্তায় কোমরসমান পানি থাকে, তাহলে সেই উন্নয়নের সুফল কোথায়-এ প্রশ্ন তাঁর।
বছরের পর বছর প্রকল্প, তবু কেন ডোবে চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। গত এক দশকে এ সমস্যা নিরসনে একাধিক বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও ভারী বৃষ্টিতে নগর ডুবে যাওয়ার চিত্র বদলায়নি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি বড় প্রকল্পে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও বর্ষায় চট্টগ্রাম ফের পানির নিচে চলে যায়।
এর মধ্যে চলমান জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের শুরুতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। প্রকল্পে প্রতিরক্ষা দেয়াল, সেতু ও কালভার্ট, সিল্ট ট্র্যাপ, নিয়ন্ত্রক, নতুন নালা নির্মাণ, খালের পাশে সড়ক নির্মাণ এবং নালা সম্প্রসারণের মতো কাজ রয়েছে। চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ৯৫ শতাংশ বলে জানানো হয়েছিল।
তারপরও মাত্র কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে নগরের বড় অংশে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা, খাল-নালার ধারণক্ষমতা, দখল ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানি নিষ্কাশনের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে চলতি বছর আরো বড় পরিসরে জলাবদ্ধতা নিরসনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন পরিকল্পনায় নগরের ২১টি খাল পুনঃখনন ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ৪০ থেকে ৫০টি জলপথকে আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এ পরিকল্পনার প্রস্তাবিত ব্যয় ৩ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিপুল অর্থের প্রকল্প, বছরের পর বছর খনন ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং নতুন নতুন পরিকল্পনার পরও যদি কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে নগরের প্রধান সড়ক ও জনবসতি ডুবে যায়, তাহলে শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়-সেগুলোর বাস্তবায়ন, রক্ষণাবেক্ষণ ও সমন্বিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৃষ্টির সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন সংকটও: চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাবও পড়েছে নগরের পরিবহন ব্যবস্থায়। গ্যাসের অভাবে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা সড়কে নামেনি। ফলে জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন ধীরগতির পাশাপাশি গণপরিবহনের সংকটও তৈরি হয়। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে।
নগরের বাইরে আশপাশের উপজেলাগুলোতেও ভারী বৃষ্টির প্রভাব পড়েছে। বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর-সাতগড়িয়াপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সঙ্গে নতুন করে বৃষ্টির পানি যুক্ত হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের ভোগান্তি বেড়েছে। সড়কে পানি জমে থাকায় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই একই ধরনের জলাবদ্ধতা ফিরে আসে। এবারও রাতভর বৃষ্টির পর সকালেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার নিয়েছে। তাঁদের দাবি, তাৎক্ষণিকভাবে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে চলা জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ নিতে হবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় আরো ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাসের মধ্যে নগরবাসীর উদ্বেগও বেড়েছে। ফলে এখন সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে দ্রুত পানি নিষ্কাশন, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কা মোকাবিলায় প্রস্তুতি।
সানা/আপ্র/১৭/৮/২০২৬