সম্পদ জীবনের এক অপরিহার্য চালিকাশক্তি, সভ্যতার অগ্রগতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ভিত্তি। অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয়ের জোগানদাতা হিসেবে সম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু এই সম্পদ যখন জীবনযাত্রার অনুষঙ্গ না হয়ে জীবনের একমাত্র লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, তখনই তা আশীর্বাদের মোড়ক থেকে বেরিয়ে এসে অভিশাপ বা শত্রুর রূপ ধারণ করে। সম্পদের এই দ্বান্দ্বিক রূপটি প্রাচীনকাল থেকেই দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ ও লোকগাথার পাতায় নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়েছে। সম্পদ কখন মিত্র থেকে শত্রুতে রূপান্তরিত হয়, তা অনুধাবন করতে হলে আমাদের এর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক গভীরতা স্পর্শ করতে হবে। এ বিষয় নিয়েই এবারের লাইফস্টাইল পাতার প্রধান ফিচার
গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল মনে করতেন, সম্পদ কেবল বিনিময়ের একটি মাধ্যম; একে জীবনের পরম লক্ষ্য করা মূর্খতা। তিনি সতর্ক করেছিলেন যে, যখন মানুষ অর্থের দাস হয়ে পড়ে, তখন সে তার নৈতিকতা ও যুক্তিবোধ বিসর্জন দেয়। সম্পদের প্রলোভন এমনই এক মরীচিকা- যা মানুষকে তার নিজস্ব মানবিক গুণাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। প্রাচ্যের নীতিশাস্ত্রেও আমরা একই সুর শুনতে পাই। মহাভারতের শিক্ষা অনুযায়ী, অতি সম্পদ মানুষকে অহংকারী করে তোলে এবং সেই অহংকারই তার ধ্বংসের কারণ হয়। দুর্যোধনের সম্পদ ও ক্ষমতার লিপ্সা যেমন কুরুবংশ ধ্বংস করেছিল, আজও আমরা দেখি মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়তে গিয়ে আত্মীয়তা, সততা ও বিবেক বিসর্জন দিচ্ছে। এখানে সম্পদ নিজেই শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ তা মানুষকে তার মানবিক পরিচয় থেকে বিচ্যুত করেছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সম্পদের শত্রুতা শুরু হয় যখন তা উৎপাদনের বা উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে অলস পুঞ্জীভূত স্তূপে পরিণত হয়। আধুনিক অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্পদের ‘ল্যাভিশ কনজাম্পশন’ বা বিলাসিতার প্রবণতা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়; তখন তা কেবল ব্যক্তিকেই নয়, অর্থনীতির ভারসাম্যকেও নষ্ট করে। কার্ল মার্কস যেমনটি বলেছিলেন, পুঁজি যখন কেবল পুঁজি তৈরির উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয় এবং শ্রম ও মানবিকতাকে অগ্রাহ্য করে, তখন তা সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ব্যক্তিগত পর্যায়ে, যখন আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খরচ বা বিলাসিতার মানসিকতা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়, যাকে আমরা ‘লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন’ বলি, তখন সম্পদ মানুষকে মুক্তির বদলে এক অদৃশ্য কারাগারের বন্দি করে ফেলে। এই বন্দিদশায় সম্পদ আর নিরাপত্তার উৎস থাকে না; বরং তা দুশ্চিন্তা ও নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাচীন গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির রাজা মিডাসের গল্পটি সম্পদের এই অভিশাপের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। মিডাস চেয়েছিলেন, তার হাতের ছোঁয়ায় সবকিছু সোনা হয়ে যাক। কিন্তু যখন তিনি খেতে গেলেন, খাবারও সোনা হয়ে গেল; আর যখন তার প্রিয় কন্যাকে স্পর্শ করলেন, সেও সোনার মূর্তিতে পরিণত হলো। সম্পদ এখানে চরম শত্রুতে পরিণত হয়েছে, কারণ তা জীবনকে প্রাণহীন করে তুলেছে। রূপক অর্থে, এটিই বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা। আজ বহু মানুষ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও মানসিক প্রশান্তিহীনতায় ভুগছে। তাদের সম্পদ তাদের সম্পর্কের উষ্ণতা কেড়ে নিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে ঘুমের স্বাভাবিকতা। তারা সম্পদ পাহারা দিতে গিয়ে নিজের জীবনকেই হারিয়ে ফেলেছে।
সম্পদ কখন শত্রুতে পরিণত হয়—এর একটি গাণিতিক বা তথ্যভিত্তিক উত্তরও রয়েছে। মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট পর্যায়ের পর সম্পদের বৃদ্ধি মানুষের সুখের সূচককে আর বাড়াতে পারে না। একে বলা হয় ‘ইস্টারলিন প্যারাডক্স’। মানুষ যখন তার মৌলিক চাহিদা পূরণের পরও সম্পদের পেছনে ছুটতে থাকে, তখন সে ‘হেডোনিক ট্রেডমিল’-এ আটকা পড়ে। অর্থাৎ, সে আরও বেশি চায়। কারণ খুব দ্রুতই বর্তমান সম্পদের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এই আকাক্সক্ষার কোনো শেষ নেই। আর এ অন্তহীন দৌড়ই মানুষকে বিষণ্নতা ও উদ্বেগের দিকে ঠেলে দেয়। আমেরিকার বিখ্যাত শিল্পপতি জন ডি. রকফেলারের নামে একটি বহুল প্রচলিত উক্তি রয়েছে- ‘আমি আমার জীবনে যা আয় করেছি, এর চেয়ে বেশি হারিয়েছি আমার মানসিক শান্তি।’ এই শান্তিহীনতাই সম্পদের প্রথম শত্রুতা।
সম্পদ তখনই শত্রুতে পরিণত হয়- যখন তা মানুষের সৃজনশীলতাকে মেরে ফেলে। মানুষ যখন মনে করে তার কাছে প্রচুর সম্পদ আছে, তখন সে পরিশ্রম করা বা নতুন কিছু সৃষ্টি করার প্রেরণা হারিয়ে ফেলে। এই অলসতা কেবল ব্যক্তিগত নয়, সমষ্টিগত অবক্ষয়েরও সূচনা করে। সম্পদ যখন উত্তরাধিকারসূত্রে বিনাশ্রমে প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করে, তখন তা পরবর্তী প্রজন্মের চারিত্রিক অবক্ষয়ের কারণ হতে পারে। অনেক ধনী পরিবারের সন্তানদের বিপথগামী হওয়ার একটি কারণ হলো সম্পদের প্রাচুর্য, যা তাদের সংগ্রাম করার ক্ষমতা ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা কমিয়ে দেয়। এই ক্ষেত্রে সম্পদ তাদের চারিত্রিক বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে ওঠে।
প্রাচীন ভারতের ‘পঞ্চতন্ত্র’-এ সম্পদের মোহ সম্পর্কে সাবধান করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যে সম্পদ অর্জনের জন্য অধর্ম করতে হয়, যে সম্পদ রক্ষা করতে গিয়ে ভয় পেতে হয় এবং যে সম্পদ ব্যয় করতে গিয়ে কষ্ট হয়, তা প্রকৃত সম্পদ নয়; তা কেবল দুর্ভোগের নামান্তর। সম্পদ শত্রু হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব তৈরি করে। যখন মানুষ মানুষকে নয়, বরং মানুষের পকেট বা সম্পদকে মূল্যায়ন করতে শেখে, তখন সম্পর্কের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়। এই কৃত্রিমতা মানুষের একাকিত্ব বাড়িয়ে দেয়। একাকী অথচ প্রাচুর্যময় জীবন যে কতা বিভীষিকাময় হতে পারে, তা ইতিহাসের বহু ক্ষমতাধর ও ধনী ব্যক্তির জীবনের শেষ অধ্যায় দেখলেই স্পষ্ট হয়।
সম্পদকে বন্ধু রাখার একমাত্র উপায় হলো এর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। সম্পদকে জীবনের লক্ষ্য না বানিয়ে জীবনের একটি উপকরণ হিসেবে দেখা। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ যেমন বলেছিলেন, সম্পদের প্রকৃত সার্থকতা এর ভোগে নয়, বরং এর সঠিক ব্যবহারে—যা সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখে। দান, পরোপকার এবং বিনিয়োগ- এ তিন পথেই সম্পদ তার বন্ধুত্বের রূপ ধরে রাখে। যখনই এই পথ থেকে বিচ্যুতি ঘটে এবং সম্পদ কেবল নিজের আভিজাত্য প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখনই তা শত্রুরূপে আবির্ভূত হয়।
প্রকৃতপক্ষে সম্পদ নিজে ভালো বা মন্দ কিছু নয়; এর রূপ নির্ভর করে মালিকের মনস্তত্ত্ব ও দর্শনের ওপর। আগুন যেমন রান্না করতে সাহায্য করে, আবার ঘরও জ্বালিয়ে দিতে পারে, সম্পদও তেমনি মানুষের জীবনের উন্নয়নের চাবিকাঠি হতে পারে, আবার ধ্বংসের কারণও হতে পারে। সম্পদ যখন মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যখন তা মানুষের হৃদয়ে লোভের জন্ম দেয় এবং বিবেক বিসর্জন দিতে বাধ্য করে, তখনই তা তার সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হয়। জীবনের সার্থকতা সম্পদের পরিমাণে নয়, বরং সম্পদের মাধ্যমে অর্জিত তৃপ্তি, শান্তি এবং তা দিয়ে অন্যের উপকার করার মধ্যেই নিহিত। যে মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়েও অন্তরে নিঃস্ব, সে আসলে সম্পদেরই শিকার। তাই জীবনের পথে সম্পদের মোহে পথ হারানো নয়; বরং সম্পদকে জয় করে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করাই সম্পদকে মিত্র হিসেবে ধরে রাখার একমাত্র দর্শন। যখন সম্পদ আপনার উদ্বেগের উৎস না হয়ে কল্যাণের উৎস হবে, তখনই আপনি বুঝতে পারবেন—আপনি সম্পদকে শত্রু নয়, বরং জীবনপথের একজন বিশ্বস্ত সাথী করতে পেরেছেন।
কেএমএএ/আপ্র/০৬.০৭.২০২৬