গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

বাংলায় ইফতারে ছোলা-মুড়ি খাওয়ার প্রচলন হলো যেভাবে

লাইফস্টাইল ডেস্ক

লাইফস্টাইল ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৩:৩৯ পিএম, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৪৬ এএম ২০২৬
বাংলায় ইফতারে ছোলা-মুড়ি খাওয়ার প্রচলন হলো যেভাবে
ছবি

ছবি সংগৃহীত

রমজান মাস এলে বাংলাদেশের ইফতারের টেবিল এক বিশেষ রূপ পায়। ছোলা, পেঁয়াজু, বেগুনি, চপ, হালিম, কাবাব, জিলাপি—এসব ছাড়া যেন ইফতার কল্পনাই করা যায় না। অথচ ধর্মীয় নির্দেশনায় ইফতারের জন্য এ ধরনের ভাজাপোড়া বা মশলাদার খাবারের নির্দিষ্ট কোনো উল্লেখ নেই। তাহলে কীভাবে এগুলো বাঙালির ইফতার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক রুচির দিকে তাকাতে হয়।

আরব থেকে মুঘল

ইসলামের সূচনালগ্নে ইফতার ছিল খুবই সরল। ইসলামের নবী হযরত মোহাম্মদ খেজুর ও পানি দিয়ে রোজা ভাঙতেন, এ কারণে খেজুর ইফতারের একটি সুন্নত অনুষঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আজো মুসলিম বিশ্বজুড়ে ইফতারে খেজুর প্রধান উপাদান।

তবে দক্ষিণ এশিয়ায় ইফতারের বৈচিত্র্য এসেছে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের গবেষকদের মতে, উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আরব, পারসিক ও আফগান খাদ্যসংস্কৃতির প্রভাব স্থানীয় রান্নায় মিশে যায়। বিশেষ করে মুঘল সাম্রাজ্য-এর সময় রাজদরবারি খাবার যেমন কাবাব, বিরিয়ানি, পোলাও, হালিম ইত্যাদি অভিজাত সমাজে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পরে সেগুলো ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে।

ঢাকা যখন মুঘলদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, তখন এখানকার সম্ভ্রান্ত পরিবারগুলো মুঘল খাদ্যরীতির অনুসরণ শুরু করে। সেখান থেকেই ইফতারের টেবিলে মাংস-ভিত্তিক পদ ও মশলাদার রান্নার প্রবেশ ঘটে।

আফগান-পরসিক যোগসূত্র

ছোলা বা কাবুলি চানা আফগানদের প্রিয় খাদ্য। আফগান ও পারসিক বণিক ও সৈন্যদের মাধ্যমে এই খাদ্য উপমহাদেশে আসে। বাংলাদেশে এসে এটি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, তেল ও মশলা দিয়ে নতুন স্বাদ পায়। মুড়ির সঙ্গে ছোলা খাওয়ার অভ্যাস আবার সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্ভাবন।

হালিমের ক্ষেত্রেও একই ইতিহাস প্রযোজ্য। পারসিক ‘হালিম’ বা ‘হরিসা’ ধীরে ধীরে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে স্থানীয় মশলার সংযোজনে নতুন রূপ নেয়। আজকের ঢাকাই হালিম সেই ঐতিহাসিক বিবর্তনের ফল।

পেঁয়াজু, বেগুনি ও চপ

পেঁয়াজু, বেগুনি, আলুর চপ—এসব ভাজাপোড়া খাবার মূলত উত্তর ভারতীয় নাস্তা সংস্কৃতির অংশ। ইসলাম প্রচারের সময় আরব-পরসিক প্রভাব থাকলেও, উপমহাদেশে এসে তা একধরনের “ভারতীয়করণ” ঘটে। উত্তর ভারতে ইফতারে মুখরোচক ভাজা খাবারের চল ছিল, যা পরবর্তীতে বাংলায় জনপ্রিয় হয়।

বাংলাদেশে এই ভাজাপোড়া খাবারগুলো বিশেষভাবে রমজানের সঙ্গে যুক্ত হয়। কারণ সারাদিন রোজা রাখার পর সন্ধ্যায় গরম, মচমচে, মশলাদার খাবার মানসিক তৃপ্তি দেয়, এমন মনস্তাত্ত্বিক কারণও এখানে কাজ করেছে।

আগে কেমন ছিল ইফতার

ইতিহাসবিদদের মতে, কয়েকশো বছর আগে বাংলায় ইফতার এতটা আড়ম্বরপূর্ণ ছিল না। উনিশ শতকের আগের সাহিত্য বা দলিলে ভাজাপোড়া, জিলাপি, কাবাবসমৃদ্ধ ইফতারের তেমন উল্লেখ পাওয়া যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে খেজুর বা হালকা কিছু খেয়ে পরে সরাসরি ভাত খাওয়ার প্রচলন ছিল।

অর্থাৎ, বর্তমানের সমৃদ্ধ ইফতার সংস্কৃতি তুলনামূলকভাবে আধুনিক, সম্ভবত উনিশ শতক থেকে ধীরে ধীরে এর বিকাশ ঘটে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ

ইসলামে ইফতারের মূল নির্দেশনা হলো দ্রুত রোজা ভাঙা এবং খেজুর বা মিষ্টিজাতীয় কিছু দিয়ে শুরু করা। এর বাইরে নির্দিষ্ট খাবারের বাধ্যবাধকতা নেই। ফলে বিভিন্ন দেশ নিজেদের সাংস্কৃতিক রুচি অনুযায়ী ইফতারের তালিকা গড়ে তুলেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে ইফতারে স্যুপ, রুটি, মাংস, ভাতজাতীয় খাবার বেশি দেখা যায়, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে ভাজাপোড়া বেশি প্রচলিত। অর্থাৎ, এটি ধর্মীয় বিধানের চেয়ে সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ফল।

স্বাস্থ্যগত দিক

পুষ্টিবিদদের মতে, অতিরিক্ত তেলে ভাজা খাবার নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। ডিপ ফ্রাই খাবার অ্যাসিডিটি, গ্যাস্ট্রিক, হজমের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বাইরে তৈরি খাবারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি না মানার ঝুঁকিও থাকে।

ইফতারে থাকা উচিত—সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট (খেজুর, ফল), পর্যাপ্ত পানি বা শরবত, প্রোটিন (ছোলা, ডাল, ডিম), অল্প পরিমাণ স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং অতিরিক্ত ভাজাপোড়া এড়িয়ে হালকা খাবার।

সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক কারণ

রমজান শুধু ধর্মীয় অনুশীলন নয়, সামাজিক উৎসবও বটে। পরিবার, প্রতিবেশী ও সহকর্মীদের সঙ্গে ইফতার ভাগাভাগি করার সংস্কৃতি থেকে খাবারের বৈচিত্র্য বেড়েছে। অতিথিপরায়ণতার অংশ হিসেবে টেবিলে নানা পদ রাখার প্রবণতাও ইফতারকে সমৃদ্ধ করেছে।

এছাড়া ব্যবসায়িক দিক থেকেও রমজান একটি বড় মৌসুম। ইফতারি বিক্রিকে কেন্দ্র করে নগরজীবনে আলাদা এক অর্থনৈতিক চক্র গড়ে উঠেছে, যা ভাজাপোড়া খাবারের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়েছে।

বাঙালির ইফতারের পেঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা বা কাবাব কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার ফল নয়। এগুলো এসেছে ইতিহাসের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক বিনিময়, মুঘল ও পারসিক প্রভাব, উত্তর ভারতীয় নাস্তা সংস্কৃতি, স্থানীয় উদ্ভাবন এবং সামাজিক রুচির সমন্বয়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে এখন তা প্রায় ঐতিহ্যে পরিণত।

অর্থাৎ, ইফতারের এই মুখরোচক রূপ ধর্মীয় নির্দেশনার চেয়ে বেশি, এটি বাঙালির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্বাদের বিবর্তনের গল্প।

এসি/আপ্র/২৫/০২/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

সম্প্রীতির বাংলাদেশে এখন বিরাজ করছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ
১৯ অক্টোবর ২০২৬

সম্প্রীতির বাংলাদেশে এখন বিরাজ করছে শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজ

দেশজুড়ে মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজ...

পোশাক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই ভিন্নতাকে জানানো হয় সম্মান
১৯ অক্টোবর ২০২৬

পোশাক বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়েই ভিন্নতাকে জানানো হয় সম্মান

‘লাউড শার্ট ডে’র মূল উদ্দেশ্য হলো শ্রবণশক্তির সমস্যায় আক্রান্ত শিশুদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের প্রয়োজ...

ভ্রমণে গিয়ে হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষায় সতর্কতা
১৯ অক্টোবর ২০২৬

ভ্রমণে গিয়ে হোটেল-রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড থেকে রক্ষায় সতর্কতা

ভ্রমণে গিয়ে অনেক সময় নানা রকম বিপদের মুখে পড়তে হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হচ্ছে অগ্নিকাণ্ড। তাই অগ্নি...

শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ সুস্বাদু খাবার
১৯ অক্টোবর ২০২৬

শারদীয় দুর্গাপূজার অন্যতম আকর্ষণ সুস্বাদু খাবার

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। পূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো সুস্বাদু সব খাবার। আর...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই