হিন্দু দায়ভাগা আইনের আওতায় ভাইয়ের সম্পত্তিতে তার বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকাকালে বোন উত্তরাধিকারী বা রিভার্সনার হিসেবে স্বত্ব দাবি করতে পারবেন না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার একটি জমি নিয়ে দায়ের করা দেওয়ানি রিভিশন মামলায় জারি করা রুল খারিজ করে হাইকোর্ট এ পর্যবেক্ষণসহ রায় দেন। একই সঙ্গে অধস্তন আদালতের দেওয়া রায় ও ডিক্রি বহাল রাখা হয়েছে।
বিচারপতি শেখ আবদুল আউয়াল ও বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ৯ জুলাই এ রায় দেন। পরে গত ১২ আগস্ট রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি মো. রাফিজুল ইসলাম মূল রায়টি লেখেন।
মামলার আইনজীবীরা জানান, ‘অমর কুমার দাসের উত্তরাধিকারী লিলি রানী দাস ও অন্যান্য বনাম ড. মনোরঞ্জন মহুরী ও অন্যান্য’ মামলায় আদালত ২০০৮ সালে জারি করা রুল খারিজ করে অধস্তন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। রিভিশন আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সমীরণ দাস গুপ্ত। বিবাদীপক্ষে ছিলেন আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী।
মামলার নথি অনুযায়ী চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা রামকান্ত বিশ্বাসের এক ছেলে ও তিন মেয়ে ছিলেন। ১৯২০ সালে তিনি নিজের অর্থে ছেলে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের নামে পটিয়া উপজেলার ১ দশমিক ৩৫ একর নালিশি জমি কেনেন। তবে সতীশ চন্দ্র তার বাবার জীবদ্দশাতেই মারা যান। পরে ১৯৩৩ সালে রামকান্ত বিশ্বাস মারা যান। এরপর রামকান্ত বিশ্বাসের মেয়ে শৌল বালা দাস ওই জমিতে উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা দাবি করেন। অন্যদিকে সতীশ চন্দ্র বিশ্বাসের স্ত্রী সাবিত্রী বালা জীবিত থাকাকালে ১৯৯৬ সালে জমিটি ড. মনোরঞ্জন মহুরীর কাছে বিক্রি করে দেন। এই বিক্রয়কে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৯৮ সালে পটিয়ার আদালতে দেওয়ানি মামলা করেন শৌল বালা দাস। তার অভিযোগ ছিল, জমি বিক্রির দলিলটি জাল ও প্রতারণামূলক এবং আইনগত প্রয়োজন ছাড়া জমিটি হস্তান্তর করা হয়েছে।
পটিয়ার সাব-অর্ডিনেট জজ আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে ২০০০ সালের ২২ জুন মামলাটি খারিজ করেন। পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন বাদী। চট্টগ্রামের প্রথম অতিরিক্ত জেলা জজ ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিলটি খারিজ করে অধস্তন আদালতের রায় বহাল রাখেন। এরপর ওই রায় ও ডিক্রিতে সংক্ষুব্ধ হয়ে বাদী দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারার অধীনে ২০০৮ সালে হাইকোর্টে দেওয়ানি রিভিশন আবেদন করেন। আদালত একই বছর রুল জারি করেন। দীর্ঘদিন পর চলতি বছর রুলটির শুনানি হয় এবং ৯ জুলাই তা খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
রায়ে দায়ভাগা হিন্দু আইনের অধীনে বিধবার অধিকার ও উত্তরাধিকারের বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন আদালত। হাইকোর্ট বলেন, ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী জীবিত থাকাকালে ভাইয়ের সম্পত্তিতে বোনের উত্তরাধিকারী হিসেবে কোনো অধিকার থাকে না।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুর পর তার বিধবা স্ত্রী জীবদ্দশায় স্বামীর সম্পত্তিতে স্বত্ব বা অধিকার লাভ করেন। তবে ওই সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে তার ক্ষমতা সীমিত। বিধবা ওই সম্পত্তি হস্তান্তর করলে তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার সবার থাকে না।
হাইকোর্ট বলেন, বিধবার মৃত্যুর পর যিনি ওই সম্পত্তির প্রকৃত পরবর্তী উত্তরাধিকারী বা রিভার্সনার হওয়ার আইনগত অধিকারী, কেবল তিনিই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বিধবার করা হস্তান্তরের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন।
আদালত আরো বলেন, কোনো ব্যক্তি যদি বর্তমানে বা ভবিষ্যতে ওই সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে আইনগত স্বার্থ বা অধিকারী না হন, তাহলে তিনি সম্পত্তি হস্তান্তরকে চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন না। শুধু হস্তান্তরটি আইনগত প্রয়োজনে করা হয়নি-এমন যুক্তিতেও সম্পত্তিতে অধিকারহীন কোনো ব্যক্তি মামলা করে তা চ্যালেঞ্জ করতে পারেন না।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৪/৮/২০২৬