চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের স্থায়ী অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে রোববার (২১ জুন) সুইজারল্যান্ডের একটি পাহাড়ি রিসোর্টে উচ্চপর্যায়ের শান্তি আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ।
তবে আলোচনার আগেই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ইরানি দাবি ঘিরে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
আলোচনার পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে দুই দেশ এর আগে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু লেবাননে ইসরায়েলি হামলার জবাবে শনিবার ইরানের ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কোর হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়। যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, আন্তর্জাতিক এই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনও স্বাভাবিক রয়েছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তিকে এগিয়ে নিতেই সুইজারল্যান্ডে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্র বিভাগ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় রোববার সকাল থেকেই মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স স্ত্রী উষা ভ্যান্সকে সঙ্গে নিয়ে রোববার ভোরে সুইজারল্যান্ডের এমেন বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তিনি বুর্গেনস্টক রিসোর্টে যান।
যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে মেরিল্যান্ডের একটি সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স বলেন, পারমাণবিক ইস্যু এবং লেবাননের যুদ্ধবিরতি বিষয়ে অগ্রগতির আশা করছে ওয়াশিংটন। তিনি ইঙ্গিত দেন, আলোচনা কয়েক দিন ধরে চলতে পারে।
অন্যদিকে ইরান অভিযোগ করেছে, লেবাননে হামলা চালিয়ে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতিরও পরিপন্থি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল বহনকারী ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। আন্তর্জাতিক এই নৌপথে নিরাপদ বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানিয়েছে তারা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলাকালে কিংবা এর পরেও হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে কোনো টোল নেওয়া হবে না। তবে শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হলে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সেবামূল্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র এককভাবে টোল আরোপ করতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কাতার সরকারের মালিকানাধীন বুর্গেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধি দলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিসহ নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন।
মার্কিন প্রতিনিধি দলে জে ডি ভ্যান্সের সঙ্গে রয়েছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার।
এ ছাড়া আলোচনার অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এবং দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ অসীম মুনিরও সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছেন।
ইসরায়েল শুরু থেকেই জানিয়েছে, তারা এই চুক্তির কোনো পক্ষ নয় এবং লেবাননে দখলকৃত অঞ্চল থেকে সেনা প্রত্যাহারেরও কোনো পরিকল্পনা নেই। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও যেকোনো হুমকির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৪ হাজার ৫৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে অন্তত ৩২ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।
এদিকে ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, দেশটির প্রায় ৯২ শতাংশ নাগরিক মনে করেন চলমান সংঘাতে ইরানই বেশি লাভবান হয়েছে। একই সঙ্গে মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য অর্জন করতে পেরেছেন। সূত্র: রয়টার্স
সানা/ডিসি/আপ্র/২১/৬/২০২৬