পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির এক মাসের মাথায় দলটিতে বড় ধরনের ভাঙনের আনুষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছে। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার নতুন বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বিধায়ক তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
বুধবার (৩ জুন) বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিদ্রোহী বিধায়কদের সমর্থন নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বাধীন শিবিরের দাবি, তৃণমূলের ৫৮ জন বিধায়ক এখন তাদের সঙ্গে রয়েছেন এবং তারাই দলটির প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করছেন।
নতুন বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূলপ্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাদের প্রধান পরামর্শদাতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দিকনির্দেশনার প্রধান উৎস। তিনি যদি পরামর্শদাতা হিসেবে থাকেন, তাহলে বিধানসভায় গঠনমূলক ও কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা আরো সহজ হবে।
মাত্র দুই দিন আগে তৃণমূল কংগ্রেস ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও আরেক বিদ্রোহী বিধায়ক সন্দীপনকে দল থেকে বহিষ্কার করে। অভিযোগ ছিল, তৃণমূলের নির্বাচিত বিধায়কদের স্বাক্ষর জালিয়াতির বিষয়টি তারা লিখিতভাবে বিধানসভার স্পিকারকে জানিয়েছেন। তবে বহিষ্কারের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি নাটকীয় মোড় নেয়। দেখা যায়, তৃণমূলের অধিকাংশ বিধায়কই ঋতব্রত-সন্দীপনদের পক্ষ নিয়েছেন।
ঋতব্রতকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিতে স্পিকার রথীন্দ্র বসুর কাছে একটি চিঠি জমা দেন বিদ্রোহী বিধায়করা। ঋতব্রত ও সন্দীপন ছাড়া ওই চিঠিতে আরো ৫৮ জন বিধায়কের স্বাক্ষর ছিল। একই চিঠিতে বিরোধী শিবিরের উপদলনেতাসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্বের বিষয়ও উল্লেখ করা হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, বিদ্রোহী শিবির তাদের সভানেত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামই বহাল রাখে।
চিঠি জমা দেওয়ার পর ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিদ্রোহী বিধায়করা বিধানসভার কাউন্সিল চেম্বারে বৈঠক করেন। পরে তারা স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য ও উপস্থাপিত নথিপত্র পর্যালোচনা করে স্পিকার ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। পাশাপাশি বিরোধী দলের অন্যান্য পদাধিকারীকেও অনুমোদন দেওয়া হয়।
স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতার জন্য নির্ধারিত কক্ষ খুলে দেওয়া হয়। সেখানেই সংবাদ সম্মেলন করে নতুন নেতৃত্ব নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।
ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তৃণমূলের টিকিটে নির্বাচিত দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি বিধায়ক এখন তাদের সঙ্গে রয়েছেন। বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ বিরোধী শক্তি হিসেবে তারা শাসক ভারতীয় জনতা পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা পালন করবেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, রাজ্য সরকারের কোনো ইতিবাচক ও জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ থাকলে তা সমর্থন করতেও তাদের আপত্তি থাকবে না।
সংবাদ সম্মেলনে ঋতব্রত আরো বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি তাদের রাজনৈতিক শ্রদ্ধা ও আস্থা অটুট রয়েছে। তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতিজা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাদের কোনো রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এই ভাঙনকে তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসলেও এত দ্রুত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কদের একাংশের বিদ্রোহী অবস্থানে চলে যাওয়া রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের জন্ম দিয়েছে।
সানা/আপ্র/৪/৬/২০২৬