ক্যারিবীয় সাগরের পূর্বে ডমিনিকা উপকূলের কাছে মা তিমির সন্তান জন্মদানের এক বিরল ও বিস্ময়কর দৃশ্য ধারণ করেছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে দেখা গেছে-প্রসবের সময় অন্য তিমিরা সম্মিলিতভাবে মা ও নবজাতকের সুরক্ষায় এগিয়ে এসেছে। গবেষকদের মতে, বন্য পরিবেশে তিমির জন্মদানের এত বিস্তারিত ও প্রত্যক্ষ চিত্র আগে কখনো পাওয়া যায়নি।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রায় ৩৩ ফুট লম্বা মা তিমিটিকে ঘিরে রেখেছিল একাধিক পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমি। প্রসবের সময় তারা একযোগে নবজাতক বাচ্চাটিকে বারবার পানির উপরে তুলে ধরছিল, যাতে জন্মের পরপরই সে বাতাস থেকে শ্বাস নিতে পারে। পুরো জন্মপ্রক্রিয়াটি, তিমির লেজ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে বাচ্চার জন্ম পর্যন্ত, সম্পন্ন হতে সময় লেগেছে প্রায় ৩৪ মিনিট।
গবেষণায় জানা যায়, ঘটনাস্থলে মোট ১১টি তিমি উপস্থিত ছিল। এর মধ্যে মা তিমিসহ ১০টি স্ত্রী তিমি এবং একটি কিশোর পুরুষ তিমি ছিল, যা তদারকির ভূমিকা পালন করেছে। এরা সম্মিলিতভাবে নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং জন্মের এক মিনিটের মধ্যেই তাকে পানির উপরে তুলে এনে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয়।
গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে ‘প্রজেক্ট সিএটিআই’ নামের একটি সংগঠন। ২০২৩ সালের ৮ জুলাই ড্রোনচিত্র, পানির নিচের শব্দ এবং জাহাজ থেকে তোলা আলোকচিত্রের মাধ্যমে পুরো ঘটনাটি রেকর্ড করা হয়। গবেষণার ফলাফল সম্প্রতি দুটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণার প্রধান লেখক আলা মাওলুফ জানান, জন্মের পরপরই তিমিদের মধ্যে সহযোগিতামূলক আচরণ স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। তারা নবজাতককে ঘিরে ধরে শরীর দিয়ে সমর্থন দিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে উপরে তুলেছে। এই প্রক্রিয়া কয়েক ঘণ্টা ধরে চলতে থাকে।
সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে তিমির জন্য বাতাস থেকে অক্সিজেন গ্রহণ অপরিহার্য। ফলে জন্মের পরপরই পানির উপরে উঠে শ্বাস নেওয়া নবজাতকের জন্য জীবনরক্ষাকারী। গবেষক ডেভিড গ্রুবার বলেন, জন্মমুহূর্ত তিমিদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ নবজাতক তখন সম্পূর্ণ অসহায় থাকে এবং নিজে থেকে সাঁতার কেটে উঠতে পারে না।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, জন্মদানের সময় তিমিদের শব্দ ও যোগাযোগের ধরনেও পরিবর্তন ঘটে। বিশেষত প্রসববেদনা শুরু হলে এবং আশপাশে অন্য তিমির দল উপস্থিত হলে তাদের ডাকের ভঙ্গি বদলে যায়।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সহযোগিতায় অংশ নেওয়া তিমিরা দুটি ভিন্ন পরিবারের সদস্য ছিল, যারা সাধারণত আলাদা দল হিসেবে বিচরণ করে। কিন্তু জন্মের সময় তারা একত্রিত হয়ে এক অনন্য সামাজিক সংহতির পরিচয় দিয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি তিমিদের উন্নত সামাজিক কাঠামো ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ।
বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এ ধরনের সহযোগিতামূলক আচরণ কোটি বছরের বিবর্তনের ধারায় গড়ে উঠেছে। এর আগে দাঁতওয়ালা আরো কয়েক প্রজাতির তিমির মধ্যেও এমন আচরণের আংশিক প্রমাণ পাওয়া গেছে, তবে এ গবেষণায় তা সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।
প্রসঙ্গত, স্পার্ম হোয়েল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাঁতওয়ালা তিমি এবং এদের মস্তিষ্কও যেকোনো প্রাণীর তুলনায় বড়। এরা জটিল সামাজিক কাঠামোতে বসবাস করে, যেখানে সাধারণত মাতৃতান্ত্রিক পরিবার একত্রে থাকে এবং পরস্পরের সন্তানদের দেখাশোনা করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা শুধু তিমির জীবনচক্র নয়, বরং প্রাণিজগতের সামাজিক আচরণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/৭/৪/২০২৬