ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে পরিচালিত আকাশযুদ্ধে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটতেই হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে টানা প্রায় দুই সপ্তাহের বোমাবর্ষণে ইরান এখন আর আগের মতো শক্তিশালী নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিকদের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত হয়ে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ও বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরও জানান, লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধেও ইসরায়েলের অভিযান অব্যাহত থাকবে। এই সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরাসরি উপস্থিত না থেকে ভিডিও সংযোগের মাধ্যমে বক্তব্য দেন।
ইরানের নতুন নেতাকে ঘিরে হুমকি
সংবাদ সম্মেলনে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ও হিজবুল্লাহ প্রধান নাইম কাশেম সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে নেতানিয়াহু বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠনের কোনো নেতার জন্য তিনি “জীবন বীমা” দিতে পারেন না। তিনি বলেন, ইসরায়েল কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে তা বিস্তারিত জানানো হবে না। তবে ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাতে অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা হচ্ছে।
নেতানিয়াহুর মতে, কোনো দেশের শাসনব্যবস্থার পতন সাধারণত ভেতর থেকেই ঘটে। ইসরায়েল সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা আহত থাকতে পারেন: ট্রাম্প
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি জীবিত থাকলেও গুরুতর আহত হতে পারেন।
যুদ্ধের প্রথম দিনেই তাঁর বাবা, সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। এরপর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব দেয়।
ট্রাম্প এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁর ধারণা মোজতবা খামেনি আঘাতপ্রাপ্ত হলেও কোনোভাবে বেঁচে আছেন।
প্রথম বক্তব্যে মোজতবা খামেনি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন ঘাঁটি বন্ধের আহ্বান জানান।
তেহরানে বিস্ফোরণ, আকাশে ধোঁয়া
এদিকে শুক্রবার ভোরে ইরানের রাজধানী তেহরান শহরের বিভিন্ন এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, পূর্ব ও দক্ষিণ তেহরানের কয়েকটি স্থানে বিমান হামলার পর বিস্ফোরণের তীব্রতায় আশপাশের ভবন কেঁপে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের পর আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলা
একই সময়ে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনী নতুন করে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহর এক সদস্যকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। তবে হামলার সুনির্দিষ্ট স্থান বা এতে কোনো লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
গত কয়েক দিন ধরেই বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলের ব্যাপক বিমান হামলা অব্যাহত রয়েছে।
ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বহু আহত
অন্যদিকে উত্তর ইসরায়েলের জারজির এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির জরুরি সেবা সংস্থাগুলো। হামলায় একটি ভবনে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে, এতে আগুন ধরে যায় এবং আশপাশের বাড়িঘর ও গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে দমকল বাহিনী আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একই সময়ে ইরান নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে এবং দক্ষিণ লেবানন থেকেও হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের দুই সপ্তাহে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ
গত আটাশ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর যুদ্ধ এখন প্রায় দুই সপ্তাহে গড়িয়েছে।
এই সময়ের মধ্যে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবে উত্তেজনা কমার কোনো লক্ষণ নেই। বরং ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষের নেতারাই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সানা/আপ্র/১৩/৩/২০২৬