ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
রোববার (১ মার্চ) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে আলী খামেনির নিহত হওয়ার খবর জানানো হয়। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আলী খামেনি নিহত হওয়ার কথা বলেছিলেন। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ১৯৮৯ সালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। এর আগে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে তিনি ইরানে ইসলামি বিপ্লবে অংশ নিয়েছিলেন।
১৯৭৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে গঠিত সরকারে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি উপপ্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। ১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ইরানের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট’ (ধর্মীয় নেতাদের একটি পর্ষদ) আলী খামেনিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নির্বাচন করে; যদিও তাঁকে দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ দিতে সংবিধান সংশোধন করার প্রয়োজন পড়েছিল।
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন সেই আদর্শগত শক্তি, যিনি ইরানে পাহলভি রাজতন্ত্র অবসানের বিপ্লবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। আর আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ছিলেন সেই নেতা, যিনি ইরানের সামরিক ও আধা সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালীরূপে গড়ে তুলেছিলেন। এ ব্যবস্থা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করে ক্ষান্ত হননি, বরং দেশের সীমার বাইরে গিয়েও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে। আজকের ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা তিনিই গড়ে তুলেছিলেন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার আগে ১৯৮০-এর দশকে ইরাকের সঙ্গে দেশটির রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
দীর্ঘ যুদ্ধ, সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ার কারণে ইরানিদের ভেতর একধরনের বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। এতে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আলী খামেনির অবিশ্বাস আরো গভীর হয় বলে মত বিশ্লেষকদের। আর এই মনোভাবই তাঁর দশকব্যাপী শাসনের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
তাঁর এই ধারণাকে দৃঢ় করেছিল যে ইরানকে সব সময় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থায় থাকতে হবে। এই মনোভাব থেকেই তিনি দেশটির ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীকে (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। পরে এই বাহিনী পুরো অঞ্চলে ইরানের প্রভাব বিস্তারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা গ্রহণ করে।
খামেনি ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলার কাজও এগিয়ে নিয়েছিলেন, যাতে কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখেও স্বনির্ভরতা বাড়ানো যায়। তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কে জড়িত হওয়ার ব্যাপারে গভীরভাবে সন্দিহান থাকতেন।
আলী খামেনির প্রতিরক্ষামূলক নীতি প্রয়োজনীয় সংস্কারের পথে বাধা সৃষ্টি করছে-এমন অভিযোগের বিরুদ্ধে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতেন।
শুধু তা–ই নয়, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের ভেতরেও তাঁর শাসন মারাত্মক পরীক্ষার মুখোমুখি হয়। এর মধ্যে ২০০৯ সালে কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলকে ‘ছলনা’ দাবি করে বহু মানুষ সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। আলী খামেনি কঠোর হাতে ওই বিক্ষোভ দমন করেন। এরপর ২০২২ সালে তেহরানে মাসা আমিনি নামের এক কুর্দি তরুণীর পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরানজুড়ে তীব্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক মাস ধরে ওই আন্দোলন চলে। সেবারও কঠোর হাতেই বিক্ষোভ দমন করেছিলেন আলী খামেনি।
তবে ৩৭ বছরের শাসকজীবনে আলী খামেনি খুব সম্ভবত এ বছর জানুয়ারিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। ডলারের বিপরীতে ইরানের মুদ্রা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক দরপতন ঘিরে গত বছর ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ী ও দোকানদারেরা বিক্ষোভ শুরু করেছিলেন। সেখান থেকে পুরো দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, বিক্ষোভকারীরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের ডাক দেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন: ১৯৩৯ সালে উত্তর-পূর্ব ইরানের পবিত্র নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তাঁর বাবা একজন খ্যাতনামা মুসলিম নেতা ছিলেন। তিনি (বাবা) পার্শ্ববর্তী দেশ ইরাকের আজারবাইজানি জাতিসত্তার ছিলেন। আজারবাইজানি পরিবারটি প্রথমে উত্তর-পশ্চিম ইরানের তাবরিজে বসবাস শুরু করেছিল, পরে মাশহাদে চলে আসে। শহরটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রীদের পছন্দের স্থান। সেখানে আলী খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের প্রধান ছিলেন। আলী খামেনির মায়ের নাম খাদিজা মিরদামাদি। খামেনি নিজের মাকে পবিত্র কোরআন ও অন্যান্য বইয়ের একজন একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
খাদিজা মিরদামাদি তাঁর সন্তানের মধ্যে সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা জন্মিয়েছিলেন। পাহলভি রাজবংশের শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আন্দোলনে যোগ দেওয়াতেও মায়ের সমর্থন ছিল। চার বছর বয়সে আলী খামেনি লেখাপড়া শুরু করেন। তিনি পবিত্র কোরআন শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং মাশহাদের প্রথম ইসলামি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি হাইস্কুল শেষ করেননি; এর পরিবর্তে ধর্মতাত্ত্বিক স্কুলে ভর্তি হন এবং সে সময়ের খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিতদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে তাঁর বাবা এবং শেখ হাসেম গাজভিনিও ছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোয় আলী খামেনি নাজাফ ও কোমের আরো খ্যাতনামা শিয়া উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোয় লেখাপড়া চালিয়ে যান।
কোমে কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুসলিম ধর্মীয় নেতার সঙ্গে আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যাঁদের একজন ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। শাহ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের কারণে রুহুল্লাহ খোমিন তরুণ ধর্মশিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। এভাবেই আলী খামেনি ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। শাহ শাসনের সময় তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁকে ইরানের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসিত করা হয়েছিলেন। ১৯৭৮ সালে শাহ পাহলভি শাসনের বিরুদ্ধে ইসলামি বিপ্লব শুরু হলে তিনি বিক্ষোভে অংশ নিতে ফিরে আসেন।
সর্বোচ্চ নেতা: ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লব সফল হয়। ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসনের অবসান হয়। নতুন শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসেন আলী খামেনি। আলী খামেনি ১৯৮০ সালে অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সূচনার পর তিনি ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন।
১৯৮১ সালটি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। সেবার অল্পের জন্য তিনি গুপ্তহত্যার চেষ্টা থেকে প্রাণে রক্ষা পান। তবে তাঁর ডান হাতটি অকেজো হয়ে যায়। ওই বছরই তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। তিনিই ইরানের প্রথম ধর্মীয় নেতা, যিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যু ইসলামি বিপ্লবকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। খোমেনি মৃত্যুর আগেই তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে বহু বছর আগে থেকে নির্ধারিত আয়াতুল্লাহ হোসেইন আলী মন্তাজেরিকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আলী মন্তাজেরি ১৯৮৮ সালে বন্দীদের গণমৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সমালোচনা করেছিলেন।
পরে সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করে।
খামেনিকে নিয়োগ দিতে ওই পর্ষদকে দেশের শীর্ষপদে যোগদানের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতার শর্তগুলো শিথিল করতে হয়েছিল। কারণ, খামেনির কাছে হুজতুলইসলাম পদবি ছিল না। এটি উচ্চপদস্থ শিয়া আলেমদের একটি পদবি। নিয়ম শিথিল করে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করার পর এক ভাষণে খামেনি বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, আমি এই পদটির যোগ্য নই; হয়তো আপনি এবং আমি এ বিষয়টি জানি। এটি প্রতীকী নেতৃত্ব হবে, বাস্তব নেতৃত্ব নয়।’
প্রতীকী নয়, সত্যিকারের নেতা ছিলেন খামেনি: দায়িত্ব গ্রহণ করেই আলী খামেনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেন। খামেনি যখন ক্ষমতায় আসেন, ইরাকের সঙ্গে আট বছরের যুদ্ধে ইরানের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়। ইরানের সেনা ও সাধারণ মানুষের ওপর রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করেছিল ইরাক। এর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিশ্ব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি বলে মনে করা হয়। ফলে এ যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি ইরানের ক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় খামেনি প্রেসিডেন্ট ছিলেন। সে সময় তিনি প্রায়ই যুদ্ধক্ষেত্র পরিদর্শনে যেতেন। সেখান থেকেই তিনি আইআরজিসি আনুগত্য অর্জন করেন এবং যুদ্ধের বাস্তবতা সরাসরি উপলব্ধি করেন।
সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার পর তিনি সামরিক এবং আধা সামরিক ব্যবস্থাকে গড়ে তোলায় মনোনিবেশ করেন, যেন দেশের বিরুদ্ধে অবিরাম আক্রমণ মোকাবিলা করা যায় এবং ধারাবাহিক প্রতিরোধ নিশ্চিত হয়। সূত্র: আল-জাজিরা
সানা/ডিসি/আপ্র/১/৩/২০২৬