ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর ভোট কারচুপি, ঘুষ ও বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা। তাঁদের দাবি, আরব দলগুলো জালিয়াতির মাধ্যমে নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি তাঁরা। বিশ্লেষকদের মতে, আরব দলগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং তাদের সমর্থনে সম্ভাব্য সরকার গঠনের পথ আটকে দেওয়াই এই প্রচারের মূল উদ্দেশ্য।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থী জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। তবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো পক্ষই পায়নি। আরব দল জয়েন্ট লিস্ট ও রাআম যৌথভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে সরকার কিংবা বিরোধী - উভয় পক্ষের কাছেই সরকার গঠনে এই দল দুটির সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিরোধী জোটের প্রধান গাদি আইজেনকট বলেছেন, নির্বাচনে পরাজিত হয়েই নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা এসব অভিযোগ তুলছেন। গত বৃহস্পতিবার এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘তারা নির্বাচনে হেরে গেছে বলেই এসব করছে।’
ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ৬১টি আসন প্রয়োজন। আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটের ফল ঘোষণা করার কথা। তবে বর্তমান আসন বিন্যাসে দ্রুত নতুন সরকার গঠন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
নির্বাচনে আরব দলগুলোর প্রভাব ঠেকানোর চেষ্টা অবশ্য ভোটের আগেই শুরু করেছিলেন নেতানিয়াহু। অক্টোবরের মাঝামাঝি তিনি ও কট্টর ডানপন্থী রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টির চেয়ারম্যান বেজালেল স্মোট্রিচ আরব অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে প্রায় দুই হাজার পর্যবেক্ষক মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তাঁদের বক্তব্যে এমন ধারণা তৈরি করা হয়, যেন ওই এলাকাগুলোতে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচনের দিন সকালে ভোটের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে রাআমের তিন কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। পরে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ নিউজ জানায়, গ্রেফতারের বিষয়ে পুলিশের কাছে প্রথম তথ্য দিয়েছিলেন নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ। তিনি নিয়মিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। আদালত অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপে পুলিশের বেশির ভাগ আবেদন নাকচ করেন এবং গ্রেফতার হওয়া কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারশিবির ঘটনাটিকে ভোট কারচুপির অভিযোগ জোরালো করতে ব্যবহার করে।
ভোট গণনার সময় অভিযোগের প্রচার আরো বাড়ে। বুধবার নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি জানায়, জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের বিরুদ্ধে ঘুষ, হুমকি, সহিংসতা ও জালিয়াতির অভিযোগসংবলিত শত শত সাক্ষ্যপ্রমাণ জমা দিয়েছে তারা। নেতানিয়াহুপন্থী চ্যানেল ১৪ বিদেশি কোনো সূত্র থেকে কয়েক কোটি শেকেল অর্থ আসার সন্দেহের কথাও প্রচার করে।
এর মধ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্টের উপপ্রধান বিচারপতি নোয়াম সলবার্গ জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনিকে চিঠি লিখে বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ তদন্তের অনুরোধ জানান। পরে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম জানায়, নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর জিনি নিজেই ওই চিঠি লেখার অনুরোধ করেছিলেন। তবে সলবার্গ চিঠিতে স্পষ্ট করেন, অভিযোগের পক্ষে থাকা তথ্যপ্রমাণের গুরুত্ব তিনি যাচাই করতে পারেননি।
গত রোববার নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান, শিন বেতের প্রধান ও অ্যাটর্নি জেনারেল এক যৌথ বিবৃতিতে জানান, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও তা নির্বাচনের ফল পরিবর্তন করবে না কিংবা পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট করবে না। সলবার্গ বলেন, ‘ভোটের মাধ্যমে আপনারা যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন, তার সম্মান জানানো হবে।’
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ১৯ বছর ধরে ইসরায়েলের ক্ষমতায় রয়েছেন নেতানিয়াহু। ২০২১ সালে নাফতালি বেনেট ও ইয়ার লাপিদের নেতৃত্বে গঠিত একটি জোট সরকার তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হয়েছিল। ওই সরকারে রাআম দলও ছিল। তবে এক বছর পরই সেই সরকার ভেঙে যায়।
নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের ভাষ্য, এবার তাঁর প্রধান লক্ষ্য ইহুদি ও আরবদের মধ্যে রাজনৈতিক সহযোগিতাকে অবৈধ হিসেবে তুলে ধরা এবং তা ঠেকানো। কারণ, আরব দলগুলোর সমর্থনে বিরোধীদের সরকার গঠনের সম্ভাবনা তাঁর দীর্ঘদিনের ক্ষমতার ভিত দুর্বল করে দিতে পারে। সূত্র: সিএনএন
সানা/ডিসি/আপ্র/০৩/১১/২০২৬