ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধীর নিজের হাতে লেখা ৬৮৮টি দুর্লভ বার্তা ১৬ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়েছে। ভারতের একটি নিলোামে বিক্রি হওয়া কোনো ভারতীয় ঐতিহাসিক নথির ক্ষেত্রে এটিকে বিশ্বরেকর্ড বলে জানিয়েছে নিলোাম প্রতিষ্ঠান স্যাফরনআর্ট।
গান্ধী তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও স্বাধীনতা আন্দোলনের সহযোদ্ধা আনন্দ টি হিঙ্গোরানিকে উদ্দেশ্য করে এসব বার্তা লিখেছিলেন। ১৯৪৪ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবরের মধ্যে লেখা বার্তাগুলো পরে সংকলন করে ‘আ থট ফর দ্য ডে’ নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়।
আনন্দ হিঙ্গোরানির স্ত্রী বিদ্যার মৃত্যুর পর তিনি গভীর শোক ও একাকিত্বে ভেঙে পড়েছিলেন। একই সময়ে কানে কম শোনার সমস্যার জন্য তিনি প্রাকৃতিক চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। বন্ধুর এমন কঠিন সময়ে গান্ধী তার পাশে দাঁড়ান। হিঙ্গোরানির একাকিত্ব দূর করতে তিনি প্রতিদিন নিজের হাতে একটি করে ছোট উপদেশ বা ভাবনা লিখে পাঠাতেন।
স্যাফরনআর্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট মিনাল ভাজিরানি বলেন, গান্ধী প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্য থেকেও কিছতা সময় বের করে হিঙ্গোরানির জন্য এসব ভাবনা লিখতেন। হিঙ্গোরানি সেগুলো সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও অনুলিপি করতেন। পরে প্রকাশের জন্য লেখাগুলো প্রস্তুত করা হয়।
এই ৬৮৮টি বার্তায় গান্ধীর দর্শন ও আদর্শের নানা দিক উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সত্য, অহিংসা, আত্মনিয়ন্ত্রণ, লোভহীনতা, নির্ভীকতা, ধর্মীয় সমতা, প্রার্থনা, সেবা, শ্রম, কর্তব্য, নীরবতা, বিবেক, আত্মোপলব্ধি ও ঈশ্বরের সন্ধান। এ ছাড়া ১৯৩০ ও ১৯৩১ সালের দিকে লেখা নয়টি চিঠির একটি দলিলও নিলোামে তোলা হয়। এসব চিঠিতে আনন্দ ও বিদ্যার বিয়ে, পরিবারের অমত, আর্থিক স্বাধীনতা এবং পারিবারিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে গান্ধীর মতামত উঠে এসেছে।
হিঙ্গোরানি পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গান্ধীর এসব লেখা ও অন্যান্য সামগ্রী সংরক্ষণ করে আসছিল। স্যাফরনআর্ট ‘গান্ধী: ফ্রম দ্য কালেকশন অব আনন্দ টি হিঙ্গোরানি’ নামে মোট ৮৬টি সামগ্রীর নিলোাম আয়োজন করে।
নিলোামের আগে ৬৮৮টি হাতে লেখা বার্তার মূল্য ১৫ কোটি থেকে ২৫ কোটি রুপি নির্ধারণ করা হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সেগুলো ১৬ কোটি ২০ লাখ রুপিতে বিক্রি হয়, যা প্রায় ১২ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডের সমান।
নিলোামের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সামগ্রীর মধ্যে ছিল ‘মেসেজ অন গড’ নামে তিনটি পাণ্ডুলিপি ও চিঠির সংগ্রহ। ঈশ্বর ও ভগবদ্গীতা নিয়ে গান্ধীর দর্শনসংবলিত এ সংগ্রহ বিক্রি হয় ১ কোটি ৬৮ লাখ রুপিতে।
গান্ধীর বহনযোগ্য বাক্সে রাখা একটি চরকা, যার সঙ্গে চরকায় সুতা কাটার আধ্যাত্মিক অনুশীলন নিয়ে লেখা দুটি চিঠি ছিল, বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ রুপিতে। লেখার টেবিলে বসা গান্ধীর একটি সই করা ছবি বিক্রি হয়েছে ৭৮ লাখ রুপিতে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে তার লেখা চিঠি ও পোস্টকার্ডের সংগ্রহ বিক্রি হয়েছে ৫৮ লাখ রুপিতে। তবে নিলামের পর গান্ধীর ব্যক্তিগত চিঠি ও ঐতিহাসিক সামগ্রী হাতবদল হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইতিহাসবিদদের অনেকে।
দিল্লির ন্যাশনাল গান্ধী মিউজিয়ামের পরিচালক এ আনামালাই এ নিলোামকে গভীর উদ্বেগজনক ও বেদনাদায়ক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, গান্ধীর চিঠি ও ব্যক্তিগত সামগ্রী শুধু কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এগুলো ভারতের সাধারণ ঐতিহ্য ও ইতিহাসের অংশ। এসব উপাদান এমনভাবে সংরক্ষণ করা উচিত, যাতে ভারতসহ বিশ্বের মানুষ সেগুলো দেখতে, পড়তে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক এসব উপাদান নিলোামে বিক্রি না করে জাদুঘরে দান করার আহ্বানও জানান তিনি। তথ্যসূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২৪/৮/২০২৬