একটি পরিবারের ভাঙন কেবল দুজনের সম্পর্ক সমাপ্তি নয়; এর প্রভাব পড়ে সন্তানের মনোজগৎ, আচরণ, ভবিষ্যতের সম্পর্ক ও জীবনবোধেও। আদালতের কাগজে যে অধ্যায়ের শেষ হয়, তা অনেক সন্তানের অনিশ্চিত জীবনের সূচনা করে। বিচ্ছেদ হলো সম্পর্কের একটি বেদনাদায়ক স্বাভাবিক বিষয়। দাম্পত্য জীবনে দুই মানুষের ভালোবাসার অভাব, সম্মানের ঘাটতি, মতের অমিল হলে তারা বিচ্ছেদকেই সহজ সমাধান হিসেবে বেছে নেন। তারা হয়তো আলাদাভাবে নিজেদের জীবন সাজাতে কিংবা নতুন জীবন শুরু করতে পারেন। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া সন্তানের প্রেক্ষাপট হয় ভিন্ন। মা-বাবা নিজেদের জীবন গুছিয়ে নিতে পারলেও সন্তানের জীবন হয়ে যায় এলোমেলো। আমৃত্যু ভাঙনের দাগ রয়ে যায় তার জীবনে। এ বিষয় নিয়েই লাইফস্টাইল পাতার এবারের প্রধান ফিচার
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের কাছে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় মা-বাবা। সেই আশ্রয় ভেঙে গেলে তারা কেবল পরিবার হারায় না, হারিয়ে ফেলে পরিচিত জীবনের ছন্দও। অনেক শিশু হয়ত বুঝতেই পারে না, কেন হঠাৎ করে মা আর বাবা পাশাপাশি রোজ থাকছেন না। কেউ নিজের ভুল খুঁজতে থাকে, কেউবা মনের ভেতর ক্ষোভ জমাতে থাকে।
চোখের আড়ালে থেকে যায় নীরব পরিবর্তন: বিচ্ছেদের পর অনেক শিশুর আচরণ বদলে যায়। হারিয়ে যায় তার প্রাণবন্ত ভাব। কেউ হয়ে ওঠে অতিরিক্ত রাগী। কমে যায় পড়াশোনার মনোযোগ, ঘুম কিংবা খাওয়ার চাহিদা। কিছু শিশু বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে চায় না, আবার কেউ আগের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক আচরণ করে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই পরিবর্তন সব সময় সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় না। অনেক সময় কয়েক বছর পর, কৈশোরে বা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে মা-বাবার বিচ্ছেদের কারণে হওয়া এসব প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তৈরি হয় ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে ভয়: যে শিশুটি ছোটবেলায় মা-বাবার সম্পর্ক ভেঙে যেতে দেখেছে, তার কাছে ভালোবাসা ও স্থায়ী সম্পর্কের ধারণা অনেক সময় দুর্বল হয়ে যায়। ভবিষ্যতে নিজের সম্পর্কে জড়ানোর সময় সে সহজে কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না। ‘আমার মা-বাবার সম্পর্কই টেকেনি, আমারটা কী টিকবে?’, ‘কেউ কি আমাকে ভালোবাসবে?’, ‘সেও কি আমাকে ছেড়ে চলে যাবে?’- এমন নানা অজানা আতঙ্ক গ্রাস করে নেন তাকে। অবশ্য সবার ক্ষেত্রে এটি সত্য নয়। অনেক সন্তান বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের সম্পর্কে আরও সচেতন হওয়ার চেষ্টা করে। ভালোবাসার মানুষকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে আগলে রাখতে চায় তারা।
আর্থিক ও সামাজিক চাপ: বিচ্ছেদের পর অনেক পরিবারে আর্থিক চাপ বাড়ে। একক অভিভাবকের ওপর সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব এসে পড়ে। এতে সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা আগের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসতে পারে। সামাজিক চাপও কম হয় না। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে অনেক শিশু এখনও সহপাঠী বা আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়। এসব পরিস্থিতি তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেয়।
বিচ্ছেদের পর সন্তানকে ভালো রাখতে করণীয়: সন্তানের সামনে একে অন্যকে দোষারোপ করা থেকে বিরত থাকা; শিশুকে বোঝানো বিচ্ছেদের জন্য সে কোনোভাবেই দায়ী নয়; নিয়মিত যোগাযোগ ও সময় দেওয়ার চেষ্টা করা; সন্তানের রুটিন যতা সম্ভব অপরিবর্তিত রাখা; প্রয়োজন হলে শিশু মনোবিজ্ঞানীর সাহায্য নেওয়া।
একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অবশ্যই মূল্যবান- যদি সেখানে পারস্পরিক সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা থাকে। সন্তানের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ পরিবেশ। তা একসঙ্গে থাকা মা-বাবার কাছ থেকে হোক বা দায়িত্বশীলভাবে আলাদা থাকা দুই অভিভাবকের কাছ থেকেই হোক।
কেএমএএ/আপ্র/২৪.০৮.২০২৬