বিশ্বজুড়ে রাতের অন্ধকার ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে কৃত্রিম আলোর বিস্তারে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গত এক দশকে দ্রুত নগরায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের ফলে পৃথিবীর রাতের উজ্জ্বলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর ফলে শহর ও জনপদগুলো এতটাই আলোকিত হয়ে উঠছে যে, একসময় দৃশ্যমান অসংখ্য তারাও এখন মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে রাতের আলোর পরিমাণ প্রায় ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র রাতের উজ্জ্বলতার দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে। এর পরেই রয়েছে চীন, ভারত, কানাডা ও ব্রাজিল।
গবেষণায় উঠে এসেছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আলোর উজ্জ্বলতায় ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে সাব-সাহারান আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে রাতের আলো নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সোমালিয়া, বুরুন্ডি ও কম্বোডিয়া এ ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। পাশাপাশি ঘানা, গিনি ও রুয়ান্ডার মতো দেশেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষকদের মতে, এসব অঞ্চলে বিদ্যুৎ সুবিধার বিস্তার এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ফলেই এ পরিবর্তন ঘটছে।
অন্যদিকে, ইউরোপের দেশগুলোতে সচেতন উদ্যোগে রাতের আলোর উজ্জ্বলতা কমানো হয়েছে। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জ্বালানি সাশ্রয় নীতিমালা এবং আলোক দূষণ কমানোর প্রচেষ্টার ফলে সেখানে গড়ে প্রায় চার শতাংশ আলো কমেছে। পুরনো বাতির পরিবর্তে দিক-নির্দেশক এলইডি বাতির ব্যবহার এবং নির্দিষ্ট সময়ে সড়কবাতি বন্ধ রাখার মতো পদক্ষেপ এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ফ্রান্স এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে।
তবে সব ক্ষেত্রে আলোর উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ইতিবাচক নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বিপর্যয়ের কারণে কিছু দেশে আলো হঠাৎ কমে গেছে। লেবানন, ইউক্রেন, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানে সংঘাতের প্রভাবে জনপদগুলো অন্ধকারে ডুবে গেছে। একইভাবে হাইতি ও ভেনেজুয়েলায় অর্থনৈতিক সংকট ও বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে আলোর পরিমাণ কমেছে।
গবেষণায় প্রতিদিনের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পৃথিবীর আলোর চিত্র স্থির নয়; বরং এটি ক্রমাগত পরিবর্তনশীল। কোথাও আলো বাড়ছে, কোথাও কমছে, আবার কোথাও স্থানান্তরিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম আলোর এই বিস্তার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আলোক দূষণের কারণে রাতের বন্যপ্রাণীর জীবনচক্র, অভিগমন এবং মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে রাতের এই উজ্জ্বলতা যেমন দৃশ্যমান, তেমনি এর পরিবেশগত প্রভাবও ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ফলে উন্নয়ন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এখন সচেতন নীতিনির্ধারণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১১/৪/২০২৬