নব্বইয়ের দশকে এক বিচিত্র গবেষণার উদ্দেশ্যে মহাকাশে প্রায় আড়াই হাজার জেলিফিশ পাঠিয়েছিল নাসা। লক্ষ্য ছিল, ওজনহীন পরিবেশে প্রাণীর শারীরিক বৃদ্ধি ও অভিকর্ষ বোঝার সক্ষমতা কীভাবে কাজ করে তা জানা। তবে নয় দিন পর সেই জেলিফিশের সংখ্যা বেড়ে ৬০ হাজারে দাঁড়ালে এবং পৃথিবীতে এদের ফিরিয়ে অনলে বিজ্ঞানীদের সামনে এল বিস্ময়কর ফলাফল।
বিবিসি ওয়াইল্ড লাইফ ম্যাগাজিন প্রতিবেদনে লিখেছে, ১৯৯০-এর দশকে নাসার ডরোথি স্প্যানজেনবার্গের নেতৃত্বে একদল গবেষক এ পরীক্ষাটি চালিয়েছিলেন।
‘মানুষ যদি কখনও মহাকাশে বাস করতে পারে তবে সেখানে জন্ম নেওয়া শিশুরা অভিকর্ষ বলের প্রতি কেমন সাড়া দেবে’ তা বুঝতেই ছিল নাসার এ অভিযান।
১৯৯১ সালে ‘কলম্বিয়া’ মহাকাশযানে করে প্রায় আড়াই হাজারটি জেলিফিশের ‘পলিপ’ বা জেলিফিশের জীবনের প্রাথমিক পর্যায় মহাকাশে পাঠানো হয়। জেলির মতো সামুদ্রিক প্রাণীগুলোর সঙ্গে মানুষের খুব একটা মিল নেই। তবে একটি বিষয়ে অদ্ভুত মিল রয়েছে। মানুষ ও জেলিফিশ উভয়ই অভিকর্ষ বল ব্যবহার করে বুঝতে পারে কোনটি ‘উপরের দিক’।
জেলিফিশ যখন ‘পলিপ’ থেকে ‘মেডুসা’ পর্যায়ে বড় হয়ে ওঠে তখন এর মূল দেহে (যাকে বেল বা ঘণ্টা বলা হয়) ক্যালসিয়াম সালফেট ক্রিস্টাল বা দানা তৈরি হয়।
এসব দানা বা ক্রিস্টাল একটি কোষের পকেটে বন্দি থাকে, যার আশপাশ বিশেষ এক ধরনের রোম বা চুল দিয়ে ঢাকা। জেলিফিশ যখন পানির নিচে দিক পরিবর্তন করে তখন অভিকর্ষ বলের কারণে এসব ক্রিস্টালও একই দিকে গড়িয়ে যায়। ওই রোম নড়াচড়া বুঝতে পারে ও স্নায়ুর কোষে সংকেত পাঠায়। এ পদ্ধতি ব্যবহার করেই জেলিফিশ বোঝে এরা সাঁতার কেটে উপরের দিকে যাচ্ছে নাকি নিচের দিকে।
মানুষের কানের ভেতরের অংশেও ক্যালসিয়াম কার্বনেটের এমন কিছু গঠন রয়েছে, যা সংবেদনশীল লোমগুলোকে নাড়াচাড়া করতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে মানুষের মস্তিষ্ক অভিকর্ষ বা গ্র্যাভিটি অনুভব করতে পারে।
ফলে গবেষকরা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন, মহাকাশে বেড়ে ওঠা জেলিফিশদের এই অভিকর্ষ সংবেদনশীল পদ্ধতিটি ঠিকঠাক তৈরি হয় কি না। কারণ ওজনশূন্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা মানুষের ক্ষেত্রেও হয়ত একই ধরনের ফলাফল দেখা দিতে পারে।
অভিকর্ষ শনাক্তকরণ পদ্ধতি: জেলিফিশের ‘পলিপ’গুলোকে কৃত্রিম সমুদ্রের পানি ভর্তি ব্যাগে করে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে থাকা গবেষকদের কাজ ছিল সেগুলোর দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করা। পরীক্ষাটি প্রায় নয় দিন স্থায়ী হয়েছিল এবং এর মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার জেলিফিশের জন্ম ও বিকাশ ঘটে। এদের পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার পর গবেষকরা দেখেছেন, এসব জেলিফিশ সাঁতার কাটতে হিমশিম খাচ্ছে, অথচ পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা জেলিফিশগুলোর কোনো সমস্যাই হচ্ছিল না।
মহাকাশ থেকে আসা জেলিফিশগুলোর দেহে ‘স্পন্দনের অস্বাভাবিকতা’ও দেখা দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব জেলিফিশ তীব্র ‘ভার্টিগো’ বা মাথা ঘোরার সমস্যায় ভুগেছে। জেলিফিশগুলো মহাকাশে থাকাকালীন এদের দেহে ক্যালসিয়াম সালফেট ক্রিস্টাল তৈরি করতে পারলেও পৃথিবীতে ফিরে এসে জীবনযাপনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি। যার থেকে ইঙ্গিত মেলে, মহাকাশে জন্ম নেওয়া মানুষের ক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।
সানা/ডিসি/আপ্র/১০/৩/২০২৬